ধামরাইয়ে ভোটের সমীকরণ: অভিজ্ঞতা বনাম পরিচিতির চ্যালেঞ্জ
ঢাকার ধামরাই উপজেলায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ক্রমেই জমে উঠছে ভোটের মাঠ। ঢাকা-২০ আসনে এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও তিনবারের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. তমিজ উদ্দিন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী প্রকৌশলী নাবিলা তাসনিদের মধ্যে। তবে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ও মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় দুই প্রার্থীর অবস্থান ও কৌশলে স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ধামরাই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত ঢাকা-২০ আসন। আয়তনের দিক থেকে ঢাকার সর্ববৃহৎ এই উপজেলায় মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৬ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৭ হাজার এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৮৮ হাজার। বিশাল ভোটারভিত্তির এই আসনে ভোটারদের মন জয়ের লড়াই সহজ নয় বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অভিজ্ঞ প্রার্থী তমিজ উদ্দিন, মাঠে স্বস্তিতে বিএনপি
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. তমিজ উদ্দিন স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। তিনবার উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় তৃণমূল পর্যায়ে তার একটি সুদৃঢ় নেটওয়ার্ক রয়েছে। প্রচারণা শুরুর পর থেকেই তিনি নিয়মিত ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন, অংশ নিচ্ছেন পথসভা ও জনসভায়।
এ বিষয়ে মো. তমিজ উদ্দিন বলেন, ‘ধামরাইয়ের মানুষ আমাকে দীর্ঘদিন ধরে চেনে। আমি তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার ছিলাম। নির্বাচিত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজ ও মাদকমুক্ত ধামরাই গড়াই হবে আমার প্রধান অগ্রাধিকার।’
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আবদুর রউফ দলীয় সিদ্ধান্তে সরে গিয়ে এনসিপির প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ায় বিএনপি শিবিরে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় বিএনপি নেতারা মনে করছেন, শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় জয় তাদের নাগালেই থাকবে।
শেষ সময়ে মাঠে নাবিলা, পরিচিতিই বড় চ্যালেঞ্জ
অন্যদিকে, ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী প্রকৌশলী নাবিলা তাসনিদের জন্য এই নির্বাচন অনেকটাই নতুন অভিজ্ঞতা। দীর্ঘ সময় ধরে মাঠে থাকার সুযোগ না পাওয়ায় ভোটারদের কাছে নিজেকে পরিচিত করাই এখন তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে জামায়াতসহ জোটের নেতাকর্মীদের সমর্থনকে পুঁজি করে তিনি প্রচারণা জোরদার করেছেন।
প্রচার কার্যক্রম নিয়ে নাবিলা তাসনিদ বলেন, ‘আমি রাজনীতিতে নতুন হলেও কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ধামরাইকে একটি নিরাপদ, কর্মসংস্থানমুখী ও দুর্নীতিমুক্ত উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। মানুষ পরিবর্তন চায়, আর সেই পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেই আমাকে দেখছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়নিষ্ঠ রাজনীতিই তার প্রধান শক্তি।’ জোটের নেতাকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে আশাবাদী করে তুলেছে বলেও জানান তিনি।
বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রভাব
এই নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের অংশ হয়েও খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো. আশরাফ আলী বিদ্রোহী হিসেবে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি জাতীয় পার্টির আহছান খান, এবি পার্টির হেলাল উদ্দিন আহাম্মদ এবং বাংলাদেশ জাসদের মো. আরজু মিয়াও প্রার্থী হওয়ায় ভোটের সমীকরণে কিছুটা হলেও জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় পরিচয়ের বাইরেও তারা এমন নেতৃত্ব চান, যিনি বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন, ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নেবেন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন।
এদিকে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে ধামরাই উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এস এম সাদিকুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন এবং কেউ কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা না করতে পারে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা মাঠে থাকবে।’
সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতা ও পরিচিতির সুবিধা নিয়ে এগিয়ে থাকা বিএনপি প্রার্থী এবং পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে মাঠে নামা এনসিপি প্রার্থীর লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার পাল্লা ভারী হয়, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত।