নিজের সঙ্গে কথা বলা কি অস্বাভাবিক?
বাসার জানালায় তাকিয়ে আপন মনে বিড়বিড় করে কিছু বলা, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই সাহস দেওয়া, কিংবা কঠিন কোনো সিদ্ধান্তের আগে নিজের সঙ্গে নিজেই তর্কে জড়ানো—এমন অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। তবে হঠাৎ খেয়াল হলে আমরা লজ্জা পেয়ে যাই আর মনে হয়, আমি কি একটু অদ্ভুত হয়ে যাচ্ছি?
সমাজে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, নিজের সঙ্গে কথা বলা মানেই যেন অস্বাভাবিক আচরণ। অথচ মনোবিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি মোটেও অস্বাভাবিক নয়; বরং নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে এটি হতে পারে মানসিকভাবে স্বাস্থ্যকর একটি অভ্যাস।
নিজের সঙ্গে কথা বলার স্বাভাবিকতা
মনোবিজ্ঞানে নিজের সঙ্গে কথা বলাকে বলা হয় ‘সেল্ফ-টক’। এটি হতে পারে জোরে বলা অথবা মনে মনে বলা। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদিন নিজের সঙ্গে কথা বলে। কখনো কাজের পরিকল্পনা করতে, কখনো মনকে শান্ত করতে, কখনো আবার নিজেকে অনুপ্রাণিত করতে। বিশেষ করে চাপের মুহূর্তে বা সিদ্ধান্তহীনতায় পড়লে নিজের সঙ্গে কথা বলার প্রবণতা বাড়ে।
মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী গ্যারি লুপিয়ান–এর গবেষণায় দেখা যায়, নিজের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলা মনোযোগ বাড়াতে এবং স্মৃতিশক্তি সক্রিয় করতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, চাবিটা কোথায় রাখলাম?—এমন কথা নিজেকে বললে মস্তিষ্ক বেশি ফোকাস করে খুঁজতে পারে।
কেন নিজের সঙ্গে কথা বলা ভালো হতে পারে
চাপ ও দুশ্চিন্তা কমায়: নিজের অনুভূতি শব্দে প্রকাশ করলে মনের ভেতরের অস্থিরতা কিছুটা হালকা হয়। এটি অনেকটা নিজের সঙ্গে থেরাপির মতো কাজ করে।
আত্মবিশ্বাস বাড়ায়: আমি পারবো, আমি চেষ্টা করছি—এ ধরনের পজিটিভ সেল্ফ-টক আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে। খেলাধুলা ও পারফরম্যান্স সাইকোলজিতে এই কৌশল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়: নিজের সঙ্গে যুক্তি-তর্ক করলে বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে ভাবা যায়। এতে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি কমে।
মনোযোগ ও কাজের গতি বাড়ে: নিজেকে নির্দেশনা দিলে কাজের ধাপগুলো স্পষ্ট হয়। যেমন, প্রথমে এইটা শেষ করি, তারপর পরেরটা।
কখন উদ্বেগের কারণ হতে পারে
যদিও নিজের সঙ্গে কথা বলা স্বাভাবিক, তবে কিছু ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া দরকার। যদি কেউ দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে নিজের সঙ্গে কথা বলে, কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, অথবা কথোপকথন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তবে সেটি মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। যেমন স্কিৎজোফ্রেনিয়া বা গুরুতর মানসিক বিভ্রমের ক্ষেত্রে এমন উপসর্গ দেখা যায়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি।
নিজের সঙ্গে কথা বলার স্বাস্থ্যকর উপায়
নেতিবাচক সেল্ফ-টক এড়িয়ে চলুন: আমি কিছুই পারি না–এর বদলে বলুন, আমি চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে বাস্তবসম্মতও সহানুভূতিশীল ভাষা ব্যবহার করুন। নিজের ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখুন। প্রয়োজন হলে ডায়েরিতে নিজের কথাগুলো লিখে ফেলুন, এতে ভাবনাগুলো আরও গুছিয়ে আসে।
সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি
আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো নিয়ে এখনও অনেক ভুল ধারণা আছে। নিজের সঙ্গে কথা বলাকে অনেকেই অস্বাভাবিক বলে দাগিয়ে দেন। অথচ মনোবিজ্ঞান বলছে, এটি মানুষের স্বাভাবিক মানসিক প্রক্রিয়ারই অংশ। বরং নিজের অনুভূতিকে চেপে না রেখে, নিজের সঙ্গে সৎভাবে কথা বলা মানসিক সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চর্চা।
নিজের সঙ্গে কথা বলা মানেই পাগলামি নয়। সঠিক প্রেক্ষাপটে এটি হতে পারে আত্ম-যত্নের একটি রূপ। তবে নিজের সেল্ফ-টক যদি অতিরিক্ত নেতিবাচক হয়ে যায় বা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়, তখন পেশাদার সহায়তা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। নিজের মনকে বুঝতে শেখাই আসলে সুস্থ থাকার প্রথম ধাপ।