Search

Search

মার্কিন হামলায় বদলে যেতে পারে ইরানের গতিপথ

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প | ছবি: সংগৃহীত

আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইরানে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। কোন কোন টার্গেটে হামলা চালানো হবে, সেগুলো মোটামুটিভাবে অনুমেয়। তবে এর পরিণতি কী হবে, সেটা এখনও কেউ জানে না। সেক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে যদি আমেরিকার সঙ্গে ইরান কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে হামলার অনুমতি দিতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সত্যিই যদি আমেরিকা ইরানে হামলা করে বসে, তাহলে সম্ভাব্য কী কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।

১. সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা

ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সামরিক ঘাঁটি ও আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ ইউনিট লক্ষ্য করে নিখুঁত হামলা চালাতে পারে মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী। এছাড়া মার্কিন বাহিনীর টার্গেট হতে পারে ব্যালিস্টিক মিসাইল লঞ্চ ও স্টোরেজ সাইট এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। এর মাধ্যমে দুর্বল হয়ে যাওয়া ইরানি সরকারের পরিবর্তন ঘটিয়ে দেশটিতে ‘প্রকৃত গণতন্ত্রের’ প্রতিষ্ঠা করবে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে এটা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কেননা ইরাক ও লিবিয়ায় পশ্চিমাদের সামরিক হস্তক্ষেপ দেশ দুটিতে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু করতে ব্যর্থ হয়। সেখানে ‘নির্মম স্বৈরশাসন’ চললেও পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপের পর নরকে পরিণত হয়েছে দেশ দুটি। বিপরীতে পশ্চিমাদের সামরিক সাহায্য ছাড়া ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে উৎখাত করে সিরিয়ার জনগণ। দেশটির অবস্থা এখন পর্যন্ত ইরাক ও সিরিয়ার চেয়ে ভালো।

২. খামেনির প্রশাসনকে রেখেই নীতিতে পরিবর্তন

এটাকে ব্যাপক অর্থে ‘ভেনেজুয়েলান মডেল’ বলা যেতে পারে। বিদ্যমান প্রশাসনের পরিবর্তন না করে দ্রুত ও শক্তিশালী অ্যাকশনের মাধ্যমে নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আনতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের ক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপ নিলে টিকে যাবে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র। তবে প্রশাসনকে ‘কাগুজে বাঘে’ পরিণত করা হবে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সিদের ওপর ইরানের প্রভাব থাকবে না। পরমাণু ও ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি থেকেও পিছু হটতে হবে ইরানকে। সেক্ষেত্রে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিপীড়নও কিছুটা শিথিল হবে।

যদিও ইরানের ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম। কেননা গেল ৪৭ বছর ধরে চেষ্টা করেও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বের মাথা নোয়াতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। আর এখন এটা প্রায় অসম্ভবই বলা যায়।

৩. সরকারের পতন ঘটিয়ে সেনা শাসন চালু

অনেকে মনে করেন, ইরানের ক্ষেত্রে এটাই ঘটতে পারে। কেননা ইরানি প্রশাসনের জনপ্রিয়তা কমেছে। আর মাঝে মাঝে ঘটা বিক্ষোভে ভেতর থেকেও দুর্বল হয়েছে ইরানি সরকার। বিপরীতে দেশের ভেতর থাকা ‘ডিপ স্টেট’ ভারসাম্য রক্ষার কাজটা করতে পারে। এখন পর্যন্ত কোনো বিক্ষোভই সফল না হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে ধরা হয়, আন্দোলনকারীদের সুনির্দিষ্ট কোনো নেতৃত্ব না থাকা। সেক্ষেত্রে ইরানে হামলা চালিয়ে প্রশাসনকে হটিয়ে দিলে ক্ষমতায় আসতে পারে আইআরজিসির নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার।

৪. মার্কিন ও প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালাতে পারে ইরান

যেকোনো ধরনের হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তেহরান বলছে, আঙুল ট্রিগারেই আছে। মার্কিন নৌ ও বিমান শক্তির কাছে ইরানের কোনো তুলনা করাই বোকামি। তবে ইরানের হাতে থাকা ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন আমেরিকাকে ঠিকই ‘বিপদে’ ফেলতে পারে।

এছাড়া বাহরাইন ও কাতারের মতো উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। সেসব ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালাতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করেছে, এমন সন্দেহে ওমানের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ টার্গেটে হামলা চালাতে পারে ইরান।

এ ধরনের ঘটনার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০১৯ সালে সৌদি আরবের পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় হামলা। ইরাক থেকে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা ওই হামলা চালিয়েছিল। তখনই বোঝা গিয়েছিল ইরানি মিসাইলের সামনে সৌদি কতটা অসহায়!

তাই ইরানের উপসাগরীয় আরব প্রতিবেশীরা ভয়ে আছে। কেননা যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলা চালালে, তা আদতে ঘুরে তাদের ঘাড়েই পড়বে।

৫. উপসাগরীয় জলপথে মাইন পুঁততে পারে ইরান

১৯৮০-১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় থেকেই বৈশ্বিক শিপিং ও জ্বালানি তেল সরবরাহ সম্ভাব্য হুমকির মুখে রয়েছে। কেননা ওই যুদ্ধের জন্য সমুদ্র যাত্রাপথে মাইন পুঁতে রেখেছিল ইরান। যদিও পরে সেগুলো অপসারণ করে রয়্যাল নেভির মাইনউইপার।

আবার ইরানের হাতে রয়েছে আরেকটি মোক্ষম অস্ত্র। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝে রয়েছে সংকীর্ণ এক সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি চেকপয়েন্ট দিয়ে প্রতি বছর বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ এবং তেল ও তেলজাত পণ্যের প্রায় ২০–২৫ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।

এখানে দ্রুতগতিতে সমুদ্র মাইন বসানোর মহড়া চালিয়েছে ইরান। যদি তারা বাস্তবেই এমনটি করে, তাহলে তা অনিবার্যভাবে বিশ্ব বাণিজ্য ও তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

৬. যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিতে পারে ইরান

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের সবচেয়ে বড় শত্রু হতে পারে ইরানের ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল দিয়ে হামলা। একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক উচ্চ-বিস্ফোরক ড্রোন ও দ্রুতগতির টর্পেডো বোট এক বা একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে। সেগুলো সংখ্যায় এত বেশি হতে পারে যে মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সময়মতো সবগুলোকে ধ্বংস করতে ব্যর্থ হতে পারে।

রই মধ্যে ইরানের প্রচলিত নৌবাহিনীর জায়গায় উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান জোরালো করেছে আইআরজিসি। বাহিনীটির মধ্যে এমন কিছু কমান্ডার রয়েছেন, যারা শাহের শাসনামলে ডার্টমাউথে প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। মূলত মার্কিন নৌবাহিনীর ৫ম বহরকে টেক্কা দিতে নিজেদের অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশলে পারদর্শী করে নিয়েছেন ইরানের নৌবাহিনীর সদস্যরা।

কোনোভাবে ইরান যদি একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে সেটির জীবিত ক্রুদের বন্দী করতে পারে, তাহলে সেটি ওয়াশিংটনের জন্য চরম অপমানের হবে। যদিও এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে এটি অসম্ভবও নয়। কেননা ২০০০ সালে এডেন বন্দরে আল-কায়েদা আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে শত কোটি ডলারের ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস কোলকে অকোজো করে দিয়েছিল। এতে ১৭ মার্কিন নাবিক নিহত হয়েছিলেন।

এর আগে, ১৯৮৭ সালে একজন ইরাকি জেট পাইলট ভুলবশত ইউএসএস স্টার্ক নামের একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে দুটি এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়েন। এতে ৩৭ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছিলেন।

৭. ইরানকে জাহান্নাম বানাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

বলা হচ্ছে, এটাই আসল বিপদ। ঠিক এ কারণেই ইরানে মার্কিন হামলা নিয়ে কাতার ও সৌদি আরবের মতো প্রতিবেশীরা বেশি ভয়ে আছে। সরকারের পতন ঘটলে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়ায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যে ধরনের সংঘাত ছড়িয়েছে, তা ইরানেও ঘটতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই নিশ্চিতভাবেই ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতন দেখে খুশি হবে। এ নিয়ে ইসরায়েল সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। ইসরায়েল ইতোমধ্যে এই অঞ্চলজুড়ে ইরানের বিভিন্ন সহযোগী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে এবং ইরানের কথিত পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবেও দেখে।

তবে কেউই চায় না মধ্যপ্রাচ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় দেশ ইরান অরাজকতায় নিমজ্জিত হোক। এতে প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে মানবিক বিপর্যয় ও শরণার্থী সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সীমান্তের কাছাকাছি এত শক্তিশালী সামরিক বাহিনী জড়ো করার পর মনে করতে পারেন যে এখনই তাকে পদক্ষেপ নিতে হবে, না হলে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। এর ফলস্বরূপ এমন একটি যুদ্ধ শুরু হতে পারে যার কোনো স্পষ্ট পরিণতি নেই এবং যার প্রভাব হতে পারে অনিশ্চিত ও সম্ভাব্যভাবে মারাত্মক।

সম্পর্কিত খবর :