আসছে তিন দেশের ইসলামিক ন্যাটো জোট, আতঙ্কে ভারত?
দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে গেল সেপ্টেম্বরে একটি নিরাপত্তা চুক্তি সই করে পাকিস্তান। অনেকটা ন্যাটোর আদলে করা সেই চুক্তিতে বলা হয়, রিয়াদ বা ইসলামাবাদের কোনো একটির ওপর হামলা হলে তা দুই দেশের ওপরই হামলা বলে বিবেচিত হবে।
ওই চুক্তির কিছুদিন আগে ৯ সেপ্টেম্বর কাতারে হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েল। প্রাণঘাতী ওই হামলার পর ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে আরব দেশগুলো। এরপর দোহায় হয় জরুরি বৈঠকও। কিন্তু সেই আলোচনায় জোরালো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন আরব নেতা। আর দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপত্তা গ্যারান্টর হিসেবে আমেরিকার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় আরব দেশগুলোর মধ্যে বাড়ে অস্বস্তি।
ঠিক তখনই দৃশ্যপটে হাজির হয় পাকিস্তান। পরমাণু শক্তিধর দেশটি সৌদি আরবের সঙ্গে করে বসে প্রতিরক্ষা চুক্তি। এখন চার মাস পর এই কৌশলগত দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে (এসএমডিএ) তুরস্কও যুক্ত হতে চায় বলে জানিয়েছে ব্লুমবার্গ।
তুরস্ক নিজেই মার্কিন নেতৃত্বাধীন ট্রান্স আটলান্টিক সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য। কিন্তু আঙ্কারা বরাবরই নিজের একটি বলয় তৈরি করতে চেয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এফ-35 যুদ্ধবিমান পাওয়া নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতা আর ইসরায়েলের সঙ্গে আঙ্কারা ‘সাপে-নেউলে’ সম্পর্ক তুরস্ককে ভিন্ন চিন্তায় বাধ্য করেছে।
সৌদি ও পাকিস্তানের কর্মকর্তারা এর আগে জোরারোপ করে বলেন, এই চুক্তি প্রতিরক্ষাগত। নির্দিষ্ট কোনো দেশকে লক্ষ্য করে এই চুক্তি করা হয়নি। তবে চুক্তিটা যে সময় হয়েছে, তা ভিন্ন কিছুরই ইঙ্গিত বহন করে। বিশ্লেষকদের ধারণা, পশ্চিম এশিয়ার একমাত্র পরমাণু শক্তিধর দেশ ইসরায়েলকে লক্ষ্য করেই এই চুক্তি করা হয়েছে।
কীভাবে কাজ করবে এই ইসলামিক ন্যাটো?
সৌদির সঙ্গে পাকিস্তানের গভীর অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। আবার যখনই পাকিস্তান আর্থিক সংকটে পড়েছে, প্রতিবারই ‘বড় ভাইয়ের’ মতো এগিয়ে এসেছে সৌদি আরব। এমনকি পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচিতে নাকি রিয়াদ সহায়তাও করেছে। তাই দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের এমন সম্পর্ক প্রতিরক্ষা খাতে গড়ানো খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু তুরস্কের সম্ভাব্য সংযোজন এই দ্বিপাক্ষিক জোটে যোগ করছে ভিন্ন মাত্রা।
বৈশিষ্ট্যগতভাবে এই জোট বৈচিত্র্যপূর্ণ। কেননা দেশ তিনটির আলাদা আলাদা শক্তির জায়গা রয়েছে। আঙ্কারা ভিত্তিক থিংক ট্যাংক টিইপিএভি’র একজন স্ট্র্যাটেজিস্ট নিহাত আলি ওজকান ব্লুমবার্গকে বলেছেন, অর্থের অবারিত সরবরাহ নিশ্চিত করবে সৌদি আরব, পাকিস্তানের আছে পরমাণু সক্ষমতা, ব্যালিস্টিক মিসাইল ও শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। আর তুরস্কের রয়েছে সামরিক অভিজ্ঞতা ও প্রতিরক্ষা খাতের মোড়ল হয়ে ওঠার মতো সাফল্যের গল্প।
এসব মিলে এই জোট হয়ে উঠতে পারে আনুষ্ঠানিক এবং সমন্বিত একটি নিরাপত্তা ব্লক, যা সৌদি-পাক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চেয়ে বেশি কিছু হয়ে উঠবে। তবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা উৎপাদন বিষয়ক মন্ত্রী রাজা হায়াত হাররাজ দিয়েছেন আরও বড় কিছুর আভাস। তিনি বিবিসি উর্দুকে বলেন, কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুরস্ক, চীন, সৌদি আরব ও আজারবাইজানের সঙ্গে ইসলামাবাদের খুব গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আর কৌশলগত নীতির ক্ষেত্রেও দেশগুলোর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
ইসলামিক ন্যাটো গঠিত হলে বিপদে পড়বে ভারত?
রিয়াদ-ইসলামাবাদের মধ্যে চুক্তির পর কোনো কোনো বিশ্লেষক সতর্ক করে দিয়ে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার জটিল সমীকরণে এবার হয়তো সৌদি আরবও ঢুকে পড়ল। এমনকি এই অঞ্চলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার দোদুল্যমান সম্পর্কের বেড়াজালে আটকা পড়তে পারে সৌদি আরব, এমন শঙ্কাও প্রকাশ করেন কেউ কেউ।
ওয়াশিংটন ডিসি ভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো আসফাদায়ার মীর আল জাজিরাকে বলেন, স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ছিল। কিন্তু ১৯৭০’র দশকে সেটি ভেঙে পড়ে। এমনকি চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের গভীর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থাকলেও তা আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে রিয়াদের সঙ্গে এই চুক্তি পাকিস্তানে বুকের ছাতি চওড়া করে দিতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
অবশ্য পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি করলেও ভারতের মতো মিত্রকে হাতছাড়া করতে রাজি নয় রিয়াদ। এ ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কারও করেছেন সৌদি কর্মকর্তারা। রয়টার্সকে দেশটির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। এই সম্পর্ক আরও জোরালো করতে চাই আমরা। আর আঞ্চলিক শান্তির যা পন্থাই অবলম্বন করতে হয়, তা আমরা করব।
> টাইমস অব ইন্ডিয়া থেকে ভাষান্তর করেছেন আহাম্মদ উল্লাহ সিকদার