বিসিবির ভাড়া করা ফ্ল্যাটে রমরমা হোটেল ব্যবসা!
বিসিবিতে কাজ করতে আসা প্রতিটি বিদেশি নাগরিকের জন্য রাজধানীর গুলশান বনানীর মতো আলিশান মহল্লায় ১৪টি ফ্ল্যাট নিয়ে ভাড়া নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। তবে এসব বাসায় মাসের পর মাস চলা অনিয়ম আর কুকীর্তির ফিরিস্তি হাতে পেয়েছে স্টার নিউজ। হোটেল ব্যবসা, আমোদ ফুর্তি কিংবা সামান্য মাইনে পাওয়া গৃহকর্মীদের কাছ থেকে কমিশন আদায়ের মতো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে বোর্ডের লজিস্টিক বিভাগের একটি চক্র।
মাসের পর মাস রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বিসিবি’র ভাড়া বাড়িতে যে নগ্ন অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে একটি সিন্ডিকেট, তা রীতিমতো চমকে দেবে দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে।
বিসিবিতে কাজ করতে আসা প্রতিটি বিদেশি নাগরিকের জন্য নেওয়া হয় ভাড়া বাসা। রাজধানীর গুলশান বনানীর মতো আলিশান মহল্লায় এমন ১৪টি বাসা নিয়ে রেখেছিল ক্রিকেট বোর্ড। তবে বিদেশি কোচদের এসব বাড়ি নিয়ে একটি চক্রের অনিয়ম আর কুকীর্তির ফিরিস্তি হাতে পেয়েছে স্টার প্লে।
গুলশানের ৪৩ নম্বর রোডের ২৯ নম্বর বাড়ি, ইস্টার্ন মহানন্দা। যেখানে একাধিক ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে রেখেছিল বিসিবি। তবে গেলো সাত মাসের বেশি সময় এখানে ফাঁকা পড়ে আছে তিনটি ফ্ল্যাট। যার একটি টাইগার পেস বোলিং কোচ শন টেইটের নামে বরাদ্ধ। তবে দায়িত্বে আসার পর থেকেই পাঁচ তারকা হোটেলে থাকেন শন টেইট।
এদিকে মাসের পর মাস ভাড়া বাবদ লাখ লাখ টাকা লোকসান বিসিবির। তবে অভিযোগ, বোর্ডের লোকসান হলেও এ থেকে ফায়দা লুটেছে লজিস্টিক ডিপার্টমেন্টের এক্সুকিউটিভের দায়িত্বে থাকা জিহাদুর রহমান সোহান।
এই সোহান ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে কাজ করছেন লজিস্টিক অ্যান্ড প্রটোকল বিভাগে। দীর্ঘ সময়ে একটি চক্র বানিয়ে বিসিবিতে কায়েম করেছেন নিজস্ব বলয়। যে বলয়ে ফাঁকা বাসায় গেল সাত মাস ধরে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে মেতেছেন আমোদ ফুর্তিতে। করেছেন হোটেল ব্যবসা। খোদ বাড়ির ম্যানেজার হারুন উর রশিদ নিজেই জানান এমন কথা।
এ ব্যাপারে জানতে বাসার ম্যানেজার হারুন উর রশিদকে ফোন দেয় স্টার নিউজ। ফোনে তিনি বলেন, ‘বাসা ফাঁকা আছে। কোনো সপ্তাহে কেউ থাকে আবার কেউ থাকে না। বিদেশি গেস্ট ছিল কিছুদিন। সব কিছু সোহান দেখাশোনা করে।’
একই অভিযোগ সরেজমিনে এসেও পায় স্টার প্লে। দীর্ঘদিন যাবৎ এই বাড়ির কেয়ারটেকারের দায়িত্বে জাহাঙ্গীর আলম। এই বাসার সার্বিক খেয়াল খবর তিনিই রাখেন। তার ভাষ্য, শুধু হোটেল ব্যবসা নয়, সোহানকে নিয়ে অভিযোগ আছে বাড়ির গৃহকর্মীদের মাঝেও।
কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর বলেন, ‘তারা বিসিবির কেউ না। এসছে বাইরের লোক। ওদের একটা লিংক আছে। ওই লিংক দিয়ে ওরা এখানে টাকা দিয়ে থাকে। অনেকেই এসছে। সবার কথা তো আর বলা যায় না।’
এই জাহাঙ্গীরের কথার সূত্র ধরেই স্টার নিউজ যোগাযোগ করে বিল্ডিংয়ের ৩০১ নম্বর ফ্ল্যাটের গৃহকর্মীর সঙ্গে। ফোনে তিনি বলেন, ‘আমাকে সন্ধ্যা ৭টার পর থাকতে বলে সোহান স্যার, আমি থাকি না এ জন্য আমাকে না বলেই বের করে দিছে। ওকে আমি বিকাশে টাকা দিয়েছি সেই স্ক্রিনশটও আমার কাছে আছে। ও আমার থেকে কমিশন নিতো।’
এবার খুঁজে বের করা হয় আরেক গৃহকর্মীকে, তার অভিযোগ, ‘স্যারদের আদেশ এলে কাজ না করে উপায় থাকে না।’ যোগাযোগ করা হলে এই গৃহকর্মী ফোনে বলেন, ‘বাসার নোংরা পরিবেশ দেখলেও মানুষ বলতে পারে সেই বাসার কী অবস্থা। বসের বাসায় গেস্ট আসতেই পারে। আমরা কাউকে চিনি না। উনারা যেভাবে বলে সেভাবেই করি। ৫০৬ নাম্বারে লোক ১০০% ছিল। আমাদের কিছু করার নাই।’
এ তো গেল বিসিবির ফাঁকা বাসায় সোহানদের হোটেল ব্যবসা, আমোদ ফুর্তি। গৃহকর্মীদের বেতন থেকে কমিশন আদায়ের পর্ব। এবার জানা যাক, প্রতিমাসে কীভাবে বিসিবির টাকা আত্মসাৎ করছে সোহানের গড়া সিন্ডিকেট।
রাজশাহী শহরের মহানন্দা আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর রোডের ৬৩ নম্বর বাসাটি ২০২৫ সালের অক্টোবরে গামিনী ডি সিলভার জন্য ভাড়া নেয় বিসিবি। যার আদ্যোপান্ত ডিল করেন জিহাদুর রহমান সোহান। অথচ বাড়ির ম্যানেজার সদরের দাবি, কম টাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বিসিবি থেকে বেশি অর্থ তুলেন সোহান। ফোনে এই সদর বলেন, ‘ওরা এখানে ভাড়া দিত ২৩ হাজার আর বিসিবি থেকে নিত ৩২ হাজার।’
এরপর এই সোহানকে খুঁজে বের করে স্টার নিউজের টিম। তবে ব্যস্ততার অজুহাতে ফোনেই আলাপ সারতে চান তিনি। সকল অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে, বারবার ফোন কেটেছেন সোহান। এরপরও ফোনে তিনি বলেন, ‘ফ্লাটে আমার ফ্রেন্ড সার্কেল আসার প্রশ্নই আসে না। যদি এমন প্রমাণ থাকে আপনি ইউজ করতে পারেন।’
এদিকে নিজের আমোদ ফুর্তি-আর হোটেল ব্যবসা অক্ষত রাখতে আগের নেওয়া একাধিক ফ্ল্যাট খালি থাকার পরও, বিসিবিতে আসা নতুন কোচদের জন্য বনানীর ৯ নম্বর রোডে নতুন করে বাসা ভাড়া নেন সোহান। একই সময়ে ৪৩ নম্বর রোডের ইস্টার্ন মহানন্দার ৩০১ নম্বর ফ্ল্যাটের চুক্তিও বাড়িয়ে নিয়েছেন। তবে ফাঁকা ফ্ল্যাট পড়ে থাকার পরও কোন লাভের আশায় নতুন করে নেওয়া হয় ফ্ল্যাট ভাড়া?