আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি, ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
বলা হয় রোহিঙ্গারা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জাতি। আরাকান অর্থাৎ রাখাইনের এই বাসিন্দারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বসবাস করলেও বৌদ্ধরা মনে করেন এরা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা জনগোষ্ঠী। ফলে বছরের পর বছর ধরে এদের ওপর চলছে নির্যাতন। এই নির্যাতনের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করে ২০১৭ সালে। রাতারাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বাড়িঘর, প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করা হয় হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে। হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠনে ভারী হয়ে ওঠে আরাকানের আকাশ।
সীমান্তে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে লাখ লাখ রোহিঙ্গা, এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। মানবিক এই বিপর্যয়ে দেশে সাময়িক আশ্রয় দেয়া হয় প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গাকে। যদিও এই সংখ্যা এখন প্রায় ১৭ লাখ ছাড়িয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মিয়ানমার, জাতিসংঘসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একের পর এক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনো সফলতার মুখ দেখেনি সেই উদ্যোগ। সেসব কথাই বলছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মনিরুজ্জামান। যিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজে।
স্টার নিউজকে তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎটা খুবই অপরিষ্কার। তারা দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আছে। কবে ফেরত যেতে পারবে এটার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কী করছে রোহিঙ্গারা? কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে লাখ লাখ রোহিঙ্গারা নিজের দেশে ফিরে যেতে মরিয়া হয়ে আছে। কিন্তু কোনো চেষ্টাই যেহেতু কাজে আসছে না তখন তাদের অনেকেই গোপনে হাতে তুলে নিয়েছে অস্ত্র। গড়ে তুলেছে সশস্ত্র বাহিনী। এমন একটি বাহিনীর খবর আসে আসে এই প্রতিবেদকের কাছে।
স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দল যোগাযোগ করে গহীন জঙ্গলে থাকা একটি বাহিনীটির সিনিয়র কমান্ডারের সঙ্গে। তিনি জানান, তাদের ঘাটি মিয়ানমারে। সেখানে যেতে হলে হাঁটতে হবে ১৫ কিলোমিটার। তাই অনুসন্ধানী দল যাত্রা করে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংগডু জেলায়। অনেক গোপনীয়তার সঙ্গে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হয়। দুর্গম পথে কয়েক ঘণ্টা পাড়ি দিয়ে তারা পৌছায় মংগডু জেলায়।
সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ের প্রতিটি ভাজে ভাজে তাদের শক্ত অবস্থান। এ যেন সুসজ্জিত কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী। এটি রোহিঙ্গাদের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন’। সংক্ষেপে যাদের বলা হয় ‘আরএসও’।
এই বিদ্রোহী বানীটির প্রকাশ্য দাবি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া, নিরাপদ প্রত্যাবাসন এবং জাতিগত নিপীড়নের অবসান। তারা বলছেন, এসব করতে কূটনৈতিকসহ সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, যার কারণে তারা অস্ত্র হাতে নিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, তাদের প্রত্যেকের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক সব অস্ত্র। আরকান আর্মি ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ঘাটি থেকে যুদ্ধ জয় করে এসব অস্ত্র তারা পেয়েছেন বলে দাবি। পর্যালোচনা দেখা যায়, তাদের ব্যবহার করা অস্ত্রগুলো চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি করা।
মিয়ানমার সরকার রাখাইন থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করলেও তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি রাজ্যটি। এখানকার বেশিরভাগ অংশই দখলে নিয়েছে আরকান আর্মি। রাখাইন রাজ্যজুড়ে এখন ত্রিমুখী সংঘাত। একদিকে সামরিক সরকার, অন্যদিকে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি, আর তৃতীয়টি হচ্ছে রোহিঙ্গা বিদ্রোহী জনগোষ্ঠী, যার মধ্যে সবচেয়ে সুসংগঠিত আরএসও।
তাদের একজন বলেন, ‘শুধু মিয়ানমার সরকার আমাদের ওপর জুলুম করে নাই। আরকান আর্মি নামক যে একটা বিদ্রোহী দল আছে, উনারা থাকবেন এক নম্বরে। আরাকান আর্মি এখনো আমাদের জাতির ওপর জুলুম-অত্যাচার করছে। সম্প্রতি দেড় লাখ পর্যন্ত রোহিঙ্গা নতুনভাবে এ শরণার্থী ক্যাম্পে যোগ দিয়েছে।’
বিদ্রোহী এই বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শত শত রোহিঙ্গা তরুণ প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন মিয়ানমারের পাহাড়ি জঙ্গলে। গোপনে চলমান এই প্রশিক্ষণের স্থান কয়েকদিন পর পর সরিয়ে নিতে হয়। দিনের পর দিন প্রশিক্ষণ শিবিরের আকার বাড়ছে বলেও দাবি তাদের। সব মিলিয়ে আরএসও’র সদস্য সংখ্যা এখন অন্তত ১০ থেকে ১২ হাজার জানিয়েছেন তারা।
আরএসওর দাবী ইতোমধ্যে রাখাইনের বেশ কয়েকটি জায়গা তারা দখলে নিয়েছে। ঘাটিও বানিয়েছে কয়েকটি জায়গায়। স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দল কথা বলে আরএসও’র সিনিয়র কমান্ডার রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তলেপাচা, বেন্ডুলা, ঢঙ্গি, পইরাবাজারসহ আরও বিভিন্ন জায়গায় আমাদের গ্রুপ আছে। এসব জায়গা আমাদের দখলে।’
কমান্ডার রফিকের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, এই বিদ্রোহী সংগঠনে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় ১৫ থেক ২৪ বছর বয়সী তরুণদের, যারা যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের জীবন দিতেও রাজি থাকেন।
আরএসও’র এই সিনিয়র কমান্ডার আরও বলেন, ‘যারা দেশপ্রেমিক আছেন, তারা চাইলে আমাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। আমাদের অস্ত্র হাতিয়ার অনেক আছে। আমরা জোর করে কাউকে নিয়ে আসিনি। এখানে যারা আসেন, নিজেরা স্বেচ্ছায় আসেন। আমরা যুদ্ধ করি দুই গ্রুপের সঙ্গে বার্মা এবং আরাকান আর্মি, এই দুটিই। এখন আরাকান আর্মির অত্যাচারে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছে। তারা যদি নির্যাতন-জুলম বন্ধ না করে, আমরা তাদের বিরুদ্ধে আছি।’
সংগঠনটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘যুদ্ধ’ করতে প্রস্তুত তারা। নিজ দেশে ফেরার প্রশ্নে স্বাধীন অঞ্চল প্রতিষ্ঠার স্বপ্নও দেখছেন তারা।
আরএসওর দাবি, মিয়ানমার সরকার ও আরকান আর্মি রোহিঙ্গাদের ওপর যে নিপীড়ন, নির্যাতন চালাচ্ছে তা কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। স্টার নিউজকে তাদের একজন বলেন, ‘আমরা অনেক সমস্যার মধ্যে আছি। এই সমস্যা বোঝানোর কোনো জায়গা নেই। আরাকান আর্মি ও আমাদের মধ্যে কোনো দুশমনি ছিল না। আরাকান আর্মিরা আমাদের মেনে নেয়নি, তারা যখন আমাদের ওপর নির্যাতন করছে এরপর থেকেই তারা আমাদের শত্রু।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ, তারপরও তারা আমাদের মা-বোনদের জায়গা দিয়েছে, আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’
যতদিন এই সমস্যার সমাধান না হবে ততদিন এই গেরিলা যুদ্ধ চলবে বলেও জানান তিনি। এছাড়াও মিয়ানমার সরকার তাদের সঙ্গে সমঝোতা না করলে বা তাদের জাতিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশ থেকে ফেরত না নিলে আরাকান অর্থাৎ রাখাইন স্বাধীন করার হুশিয়ারিও দেন তিনি।
তবে তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমরা কোনো সরকার না, গেরিলা যোদ্ধা। তাই আমরা নানান ধরনের সমস্যার মধ্যে আছি। তবে আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবো। আমরা মৃত্যুকে ভয় পাই না।’
স্টার নিউজের অনুসন্ধান বলছে, যেসব রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে তাদের মধ্যে চারটি বাহিনী সবচেয়ে শক্তিশালী। এগুলোর মধ্যে আছে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন বা আরএসও, রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা, ইসলামী মাহাজ এবং আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি। তবে এই চারটির মধ্যেও আরএসও ও আরসার কথা বেশি শোনা যায়।
আরএসও প্রথম আত্মপ্রকাশ করে আশির দশকে। তবে ২০২১ সালে মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর তারা আবারও সক্রিয় হয়েছে। ধীরে ধীরে তারা তাদের শক্তি বাড়িয়েছে। রোহিঙ্গাদের অন্যান্য বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর তুলনায় তারা বেশ শক্তিশালী। তবে সংগঠনটির দাবী, বাকি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও তাদের বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। কারণ তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক। তবে এই গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ।
রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর যে সক্ষমতা রয়েছে সে সক্ষমতা দিয়ে আরাকান আর্মি বা মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পারবে না। এতে আরও জটিলতা বাড়বে বলে জানান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘তাদের (আরএসও) অস্ত্রের উৎস কী? তারা যদি বলে থাকে যে এটা তারা মিয়ানমারের কোনো ঘাটি দখল করে নেওয়া, এটা সঠিক তথ্য নয়। তারা হয়তো অস্ত্র পেয়েছে অন্য কোনো জায়গা থেকে, অন্য কোনো উৎস থেকে।’
তবে আরএসওসহ বাকি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো কি রোহিঙ্গাদের আশা, নাকি নতুন সংকটের নাম? অস্ত্রের ভাষায় কি আদৌ ফিরে পাওয়া যায় মাটি ও পরিচয়? প্রশ্নগুলো এখনো উন্মুক্ত, কিন্তু উত্তর খুঁজতে হবে নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য।
বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত ২৭১ কিলোমিটার। এই পুরো সীমান্ত এখন নিয়ন্ত্রণ করছে মিয়ানমারের বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এদের অন্যতম আরাকান আর্মি। কিন্তু কারা এই আরাকান আর্মি? কী চায় তারা?
স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০০৯ সালে কাচিন ইন্ডিপেনডেন্ট আর্মির সহায়তায় গড়ে ওঠে আরাকান আর্মি। ২০১৫ সালে পালেতোয়া টাউনশিপে শুরু হয় তাদের সামরিক তৎপরতা। ২০২১ সালে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের যুদ্ধ শুরুর পর আরাকান আর্মিও জড়ায় এই যুদ্ধে। ২০২৩ থেকে ২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সেনাদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর রাখাইন রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টিই দখল করে নেয় আরাকান আর্মি।
সরেজমিনে দেখা যায়, নিজেদের দখল করা অঞ্চলগুলোতে সশস্ত্র তৎপরতা বাড়িয়েছে আরাকান আর্মি। তাদের প্রত্যেকের হাতে হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র। অস্ত্রের ফুটেজ যোদ্ধাদের অধিকাংশই তরুণ যুবক ও কিশোর। এই কিশোরদের হাতে একে ফরটি সেভেন রাইফেল। এই অস্ত্র ব্যবহার হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু এটি এখন নেহাত কিশোরদের হাতে।
বান্দরবানের সীমান্তজুড়ে রয়েছে আরাকান আর্মির ঘাটি। এক থেকে দেড় কিলোমিটার পর পরই কোনো না কোনো ঘাটি। এসব ঘাঁটিতে অস্ত্র হাতে ২৪ ঘণ্টা পাহারায় থাকেন আরাকান আর্মির যোদ্ধারা। ঘাটির চৌকিগুলোতে দেখা যায় তাদের পতাকা। একটি ঘাটিতে চোখ পড়ে স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দলের। সেখানে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন তরুণ যুবকের আনাগোনা। কিন্তু তাদের প্রায় সকলেই পঙ্গু। কারও হাত নেই। কারও বা পা।
আরাকান আর্মির একটি সূত্র বলছে, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে অঙ্গ হারানো তরুণদের রাখা হয়েছে এসব ক্যাম্পে। এ ঘাঁটিটি ব্যবহার হচ্ছে ওদের পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু বাংলাদেশের গা ঘেঁষে যখন এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা; তখন প্রশ্ন উঠেছে দেশের নিরাপত্তা নিয়ে। কারণ আরাকানিদের এই তৎপরতা কেবল তাদের দখল করা ভূখণ্ডের ভেতরই সীমাবদ্ধ নেই। সীমান্তের নজরদারি এড়িয়ে প্রায়ই তারা ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশে।
এছাড়াও তারা বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে পুতে রাখছে নীরব ঘাতক মাইন। সেই মাইন বিস্ফোরণে হতাহত হচ্ছেন বাংলাদেশিরা। বিজিবির টহলের জন্যেও ঝুঁকির কারণ হয়েছে এই মাইন। অথচ এভাবে প্রাণঘাতী মাইন পেতে রাখাটা আন্তর্জাতিক আইনে পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
গত এক বছরে মাইন বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন অন্তত ২৬ জন বাংলাদেশি। নিহত হয়েছেন একাধিক। গত অক্টোবরে মারা গেছেন এক বিজিবি সদস্য। মাইন বিস্ফোরণের বেশি ঘটনা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে। হতাহতের সংখ্যাও এখানে বেশি।
তাদেরই একজন বান্দরবানের ঘুমঘুমের বাসিন্দা হাসান। সীমান্তের কাছেই তার চাষের জমি। সেই জমিতে গরু আনতে গিয়েই মাইন বিস্ফোরণে উড়ে যায় হাসানের একটি পা। সেই হাসানের জীবন এখন দুর্বিষহ। তিনি বলেন, ‘রাতে এরা (আরাকান আর্মি) বাইরে চলে আসে। আমি যেখানে আক্রান্ত হয়েছি, সেই জায়গাটা সীমান্ত (তারকাটার বেড়া) থেকে ১০০-১৫০ মিটার ভেতরে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিনই আতঙ্ক, প্রতিদিন রাতেই এরা গোলাগুলি করে। এই কিছুদিন আগেও প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টার মতো গোলাগুলি হয়েছে।’
২০২৩ সাল থেকে রাখাইন রাজ্যে জান্তা সরকারের সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে আরাকান আর্মি। এই রাজ্যকে ঘিরে একটি স্বাধীন আরাকান ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে চায় তারা। রাজ্যটির বেশিরভাগই এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। এরপর থেকেই বাংলাদেশের সীমান্তে বেড়েছে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা।
এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, ‘মাইন পুতে রাখার যে আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী আছে, সেগুলো এখানে (বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত) একেবারেই ফলো করা হচ্ছে না। ফলে এটা আমাদের বেসাময়িক জনগোষ্ঠীর জন্য জীবনের ওপর হুমকি। নিরাপত্তা নিয়ে যে ধরনের পরিস্থিতি থাকা দরকার, আমাদের সীমান্ত অঞ্চলে সেটা বিঘ্নিত হচ্ছে। কাজেই আরাকান আর্মির কর্মকাণ্ড আমাদের জন্য একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বা হুমকি হিসেবে আছে।’
১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের মাইন নিষিদ্ধকরণ চুক্তিতে সই করেনি মিয়ানমার। সেই সুযোগটাই লুফে নিয়েছে আরাকান আর্মি। দেশটির সামরিক বাহিনী থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠী; একে অন্যকে দমন করতে বাড়িয়ে দিয়েছে মাইনের ব্যবহার। সীমান্তের ওপাড়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘাত চলছে অন্য গোষ্ঠিগুলোরও। তাদের অভ্যন্তরীন সংঘর্ষের গোলা-বারুদ এসে পড়ছে বাংলাদেশের সীমানায়। গোলাগুলির সময় গ্রামবাসীকে বাড়িঘর ছেড়ে যেতে হয় নিরাপদ আশ্রয়ে।
স্থানীয়রা বলেন, ‘এখানে আসে রাত্রেবেলা। যখন ওদিকে গুলাগুলি হয়, এদিকেও এসে পড়ে। তখন আমরা খুবই আতঙ্কের মধ্যে থাকি।’
এতো গেলো স্থল সীমান্তের কথা। নাফ নদীর জলসীমার অবস্থা তাহলে কেমন? বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত ভাগাভাগি করেছে নাফ নদী। প্রায় ৬২ কিলোমিটারের এই পানি পথেও ঘাটে ঘাটে নিরাপত্তাহীনতা। কয়েক মাস আগে নদী থেকে পাঁচজন জেলেকে ধরে নিয়ে যায় আরকান আর্মি। এর মধ্যে একজনের গুলিবিদ্ধ মরদেহ পাওয়া গেলেও বাকি চারজনের হদিস এখনো মিলেনি।
এক জেলের সঙ্গে নাফ নদীতেই কথা হয় স্টার নিউজের। মাছ ধরাই তার জীবীকা। কিন্তু দিন দিনই বাড়ছে তাদের নিরাপত্তা ঝুকি। ভয়ে তটস্ত থাকতে হয় সারাক্ষণ। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগেও ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে গুলি করেছে। মাছ ধরেই আমাদের পরিবারকে চালাতে হয়, তাই বাধ্য হয়েই মাছ মারতে আসি।’
কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালীর আঞ্জুমানপাড়া। এই পাড়ার পাঁচজন জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মী। তাদের একজন ইউছুফ। বছর খানেক আগে নাফ নদীতে মাছ ধরতে গেছেন। কিন্তু আর ফিরে আসেননি। সেই থেকে ছেলের অপেক্ষায় দিন কাটে মায়ের। স্মৃতি হিসেবে আছে একটি ছবি, সেটিও পেয়েছেন মাস ছয়েক পর। ছবি দেখলেই বিলোপ করে কাঁদতে শুরু করেন তিনি।
কাঁদতে কাঁদতে সেই মা স্টার নিউজকে বলেন, ‘প্রতিবেশীরা বলেছেন, বিজিবির কাছে নালিশ করতে গেলে যারা ধরে নিয়ে গেছে তারা ছেলেকে মেরে ফেলবে। তাই আমি যাইনি, ছেলে ফিরে পাওয়ার আশায় আর যাইনি।’
পাশের বাড়ির সৈয়দুল বশর। তিনিও গিয়েছিলেন নাফ নদীতে মাছ ধরতে। তার গুলিবিদ্ধ মরদেহ পেয়েছে পরিবার। কিন্তু বাকিদের কোন খোঁজ মেলেনি। তার ভাই স্টার নিউজকে বলেন, ‘প্রথমে তারা ডাক দেয়, ডাকার পরে গুলি করে। গুলি করার পরে চারজনকে নিয়ে যায়। একজনের লাশ পাওয়া যায় দুই দিন পর।’
তথ্য বলছে, গেলো এক বছরে নাফ নদী থেকে সাড়ে ৩০০-এর বেশি জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। বিজিবির সাহায্যে স্বজনদের কাছে ফিরে আসে ২০০ মানুষ। বাকি ১৫০ জনের বেশি জেলের কোনো হদিস নেই। তারা কোথায় আছে কেমন আছে জানারও কোনো উপায় নেই। তবে মাঠ পর্যায়ে বিজিবির চেষ্টারও কমতি নেই।
এ বিষয়ে রামুর সেক্টর কমান্ডার (বিজিবি) কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ স্টার নিউজকে বলেন, ‘মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর যে ক্যাম্প আছে, সেই ক্যাম্পগুলোতে এখন আরাকান আর্মি অবস্থান নিয়েছে। যেহেতু সীমান্ত নদীর মধ্যে পড়েছে তাই আমাদের জেলেরা অনেক সময় ভুল করে মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি বা ওদিকে চলে যায়। তখন মিয়ানমার আর্মি বা মিয়ানমার নেভি অনেক সময় আরাকান আর্মি আমাদের জেলেদের ধরে নিয়ে যায়।’
কিন্তু কীভাবে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবে বাংলাদেশ? দ্বন্দ সংঘাত যাই থাকুক, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের যোগাযোগের নানা উপায় থাকে। থাকে কুটনৈতিক চ্যানেল। কিন্তু আরাকান আর্মি এখন রাষ্ট্রহীন এক গোষ্ঠি। কুটনীতির ভাষায় ‘নন স্টেইট এক্টর’। যাদের রাজনৈতিক বা সামরিক নেতৃত্বটাও বিশ্বের কাছে স্পষ্ট নয়। ওদের তৎপরতার অনেকটাই গোপনীয়তার পর্দায় ঢাকা। বিজিবিও শিকার করেছে, মাঠপর্যায়ে আনঅফিসিয়াল যোগাযোগ রাখতে হয় তাদের সঙ্গে।
এ বিষয়ে ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, ‘আরেকান আর্মির সঙ্গে আমাদের ফরমাল যোগাযোগটা নেই। কারণ যেহেতু তারা কোনো সরকারি বাহিনী না কিন্তু ইনফরমাল কিছু যোগাযোগ আছে। যদি ভুল করে কিংবা ইচ্ছা করে কেউ ঢুকে যায় বাংলাদেশের ভিতরে আমরা পুশব্যাক করে দেই।’
আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, ‘বাস্তবে মাঠ পর্যায়ে যে পরিস্থিতি আছে সেটাকে আমাদের অনুধাবন করতে হবে। তাদের সঙ্গে একটা সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করে, তারা কিন্তু যোগাযোগটা করতো। কিন্তু বর্তমানে আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে এক ধরনের মনোভাব প্রকাশ করা হয়েছে যে, “আমরা এখন রাষ্ট্রের সমান প্রায়। কাজেই আমাদের যোগাযোগ এই মাঠ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে রাখতে চাই না।” আমাদের এ ব্যাপারে আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি এখনই নির্ধারণ করতে হবে। আমরা কীভাবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবো? কীভাবে আমাদের সম্পর্কটা আমরা পরিচালনা করবো।’
আরাকান আর্মিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে বাহিনীটির প্রধান তুন মিয়াত নাইংয়ের সাক্ষাতকার চেয়ে কয়েক দফা ই-মেইল করার পর তারা অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেয়নি। তবে আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এসব অভিযোগ একপাক্ষিত। সীমান্তে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মাইন পুতে রাখে বলে উল্টো অভিযোগ করেন তারা।