জুলাই বিপ্লব থেকে ফেনী’র বন্যায় সরব প্রাণবন্ত সেই ঢাবি শিক্ষার্থীর ‘আত্মহত্যা’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের (২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ) মেধাবী শিক্ষার্থী অনন্য গাঙ্গুলি। ঢাবি ক্যাম্পাসের প্রাণবন্ত মুখ অনন্য গাঙ্গুলি। ২৪-এর জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সরব ছিলেন তিনি। ২৪-এর ফেনীর বন্যা দুর্গতদের সহায়তায় অনন্য গাঙ্গুলি’র অনন্য অবদান আজও ফেসবুকে জীবন্ত। অনন্য বাজাতেন গিটার, অভিনয় করতেন শর্ট ফিল্মে। নিজেও ফিল্ম সম্পাদনা ও কোরিওগ্রাফি করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় (২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ) ‘ডি’ ইউনিটে হয়েছিলেন প্রথম।
সেই অনন্য গাঙ্গুলি গত ১ ফেব্রুয়ারি আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর পৌর শহরের বাজারপাড়া গ্রামে নিজ ঘর থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের লোকজন। এ ঘটনায় ওই পরিবার ও প্রতিবেশীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার ফেসবুক প্রোফাইল সূত্রে তেমনটি দেখা গেছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, ছোট বেলা থেকে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন অনন্য গাঙ্গুলি। ষষ্ট শ্রেণিতে থাকাকালীন গ্যাস্ট্রিকজনিত আলসারে আক্রান্ত হন অনন্য। এরপর শারীরিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন তিনি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রায়ই তিনি ক্লাসে অনিয়মিত থাকতেন। পরে ২০১৬ সালে কোটচাঁদপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর মানসিক অসুস্থতার কারণে বন্ধ হয়ে যায় তার পড়াশোনা। টানা তিন বছর ছিলেন ঘরবন্দি। নিজের ঘর থেকে তিনি বের হতেন না। পরিবারের লোকজন তাকে যশোর ও ঢাকায় চিকিৎিসা করান। অবস্থার উন্নতি না হলে তাকে ভারতের ভেলোরে একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেন। ভারতে চিকিৎসা নেয়ার পর অনন্য গাঙ্গুলির শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা ফিরে আসে। এরপর করোনাকালীন সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে তিনি ২০২১ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। কোটচাঁদপুরের সরকারি মোশাররফ হোসেন কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তির্ণ হন অনন্য।
একই বছর ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল’স এ ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে ঢাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি (২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ) ‘ডি’ ইউনিটে প্রথমস্থান অধিকার করেন। ভর্তি হন ইংরেজি বিভাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার শুরু থেকে অনন্য গাঙ্গুলির জীবন স্বাভাবিক ছিল।
জুলাই বিপ্লবে ‘অনন্য গাঙ্গুলি’
২৪ এর জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ফেসবুকে সরব ছিলেন অনন্য গাঙ্গুলি। ২৪ এর ২৬ জুলাই ছাত্রদের আন্দোলন চলাকালে তিনি নিজের ফেসবুক ওয়ালে লেখেন-‘আসেন আন্দোলন বন্ধ করে দেই। রাজপথ কর্মসূছি ছেড়ে ঘরের ছেলে চুপচাপ ঘরে ফিরে যাই। তারপর ১৪ ডিসেম্বরের জন্য এক এক করে দিন গুনতে থাকি’।
তিন পরে ২৪-এর ৩০ জুলাই নিজের ফেসবুক ওয়ালে লাল রঙের ‘প্রোফাইল ছবি’ যুক্ত করে অনন্য লেখেন- ‘কিছু রক্ত কখনোই শুকিয়ে কালচে হয়ে যায় না...।
২৪ এর ৫ আগস্ট অনন্য গাঙ্গুলি তার ফেসবুকে ‘লাল সবুজ পতাকার মাঝখানে বাংলাদেশের মানচিত্র’ খচিত ছবি শেয়ার করেন। ওই পোস্টে তিনি লেখেন, দ্যা ফার্স্ট স্টেপ টু’য়ার্ডস এ নিউ ডন’ যার বাংলা অর্থ- ‘নতুন ভোরের দিকে প্রথম পদক্ষেপ’।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘অনন্য গাঙ্গুলি’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বেশ সরব ছিলেন অনন্য গাঙ্গুলি। ছিলেন গিটারিস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’তে আয়োজিত ইংরেজি বিভাগের একটি কনসার্টে তিনি গানও পরিবেশন করেন। যার ছবি তার ফেসবুক প্রোফাইলে পাওয়া গেছে। সবশেষ, গত ১২ জানুয়ারি নিজের ফেসবুক ওয়ালে একটি রহস্যময় পোস্ট করেন অনন্য গাঙ্গুলি। একটি বিড়াল নিজের চুল দিয়ে ঢেকে রাখা ছবি পোস্ট করেন। ক্যাপশনে (ইংরেজি) লেখেন ‘মিওচাইন বন্দুকের বিরল ছবি’।
এ ছাড়া তিনি শর্ট ফিল্মে অভিনয়, সম্পাদনা ও কোরিওগ্রাফি করতেন নিয়মিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সহপাঠীদের নিয়ে একটি সাংস্কৃতিক টিম ছিল তার। এসব নিয়েই তিনি সময় কাটাতেন।
সরেজমিন যা জানা গেল
তবে অনন্য গাঙ্গুলির নিজ গ্রাম কোটচাঁদপুর পৌর শহরের বাজার পাড়ায় গিয়ে জানা গেছে ভিন্ন কথা। অনন্য’র প্রতিবেশীরা জানায়, ঢাকা থেকে বাড়িতে ফিরে অনন্য বাইরের কারো সঙ্গে তেমন মিশতেন না। বাড়িতে একা একা থাকতে পছন্দ করতেন। এলাকায় তার উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো তার ঘনিষ্ট বন্ধু-বান্ধবও নেই।
পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা জানিয়েছে, গত গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোটচাঁদপুরে নিজ বাড়িতে ফেরেন অনন্য। ওই রাতেই পরিবারের লোকজন তাকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায়। ওই সময় পরিবারের লোকজন ঘরের দরজা ভেঙ্গে অনন্য গাঙ্গুলির মরদেহ উদ্ধার করে।
জানা গেছে, অনন্য গাঙ্গুলির বাবা প্রদ্যুৎ কুমার (পি কে) গাঙ্গুলি। তিনি কোটচাঁদপুর পৌর মহিলা কলেজের (অবসরপ্রাপ্ত) অধ্যাপক। মা রাঁধা রাণী ভট্টাচার্য কোটচাঁদপুর বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। অনন্য গাঙ্গুলির জীবনাচার ছিল বৈচিত্র্যময়। তিনি কখনো চুল-দাঁড়ি বড় করে রাখতেন। কখনো চলতেন এলোমেলা হয়ে। আবার কখনো কেতাদুরস্ত হয়ে চলাফেরা করতেন।
জানা গেছে, শিক্ষক দম্পতি পি কে গাঙ্গুলি-রাঁধা রাণীর সংসারে কোনো অভাব অনটন ছিল না। ছেলেকে পরম যত্নেই তারা বড় করেছেন। তবে ছোটবেলা থেকেই অনন্য গাঙ্গুলি পড়াশোনায় খুবই আন্তরিক ছিলেন বলে জানা গেছে। তিনি বেশির ভাগ সময় বাড়িতে বসে পড়াশোনা করেই কাটাতেন। অন্যদের সঙ্গে খেলাধুলা, আড্ডা বা ঘুরাঘুরি করার অভ্যাস ছিল না অনন্য গাঙ্গুলির।
কোটচাঁদপুর শহরের বাসিন্দা ও স্কুল শিক্ষক কামরুজ্জামান কচি জানান, অনন্য গাঙ্গুলি অনেক মেধাবী ছেলে ছিল। নতুন কিছু জানার ব্যাপারে তার আগ্রহের শেষ ছিল না। সে সব সময় নতুন কিছু জানতে চাইতো। এর জন্য সে সবসময় পড়াশোনা করতো। ২০১৬ সালে এইসএসসি পাস করার পর এইচএসসিতে ভর্তি হয় অনন্য। এরপরই তার মানসিক সমস্যা ধরা পড়ে।
স্কুল শিক্ষক কামরুজ্জামান কচি বলেন, প্রফেসর পিকে গাঙ্গুলি ও স্কুল শিক্ষিকা রাধা রাণী ম্যাডাম অত্যন্ত ভদ্র মানুষ। কোটচাঁদপুর শহরের সবাই তাদের চেনে। সম্মানিত পরিবার বলা যায়। যখন অনন্য মানসিক সমস্যা থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছিল, ২০১৯ সালের দিকে। তখন আমি অনন্যর সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তার কোনো মানসিক সমস্যা আছে কিনা, তা জানার জন্য। তারপরেও অনন্য’র সঙ্গে আমার বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে, কিন্তু কখনোই তাকে অস্বাভাবিক মনে হয়নি।
তিনি আরও বলেন, মানুষ হতাশ থাকলে যেরকম এটাওটা নিয়ে ভাবে, অনেকটা ওই রকম। যতটুকু জানি, তার কোনো কাছের বা প্রিয় বন্ধু ছিল না। কথা বলার মতো তার কোনো বন্ধু ছিল না। সে কারও সঙ্গে মিশতো না। এসব কারণেই হয়তো একাকিত্বে ভুগতো সে।
অনন্য গাঙ্গুলির মা রাধা রাণী ভট্টাচার্য কান্নাকাটি করতে করতে বলেন, আমার কথা বলার কোনো অবস্থা নেই। আমি কি নিয়ে কথা বলব? কার জন্য কথা বলব? এসব কথা বলেই তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। প্রতিবেদককে তিনি পরবর্তিতে সাক্ষাৎ করার জন্যও বলেন।
এ ঘটনায় কোটচাঁদপুর থানার ওসি মো. আসাদুজ্জামান জানান, গত ১ ফেব্রুয়ারী অনন্য গাঙ্গুলি ঢাকা থেকে কোটচাঁদপুর শহরের নিজ বাড়িতে ফেরেন। ওই নিজ ঘরে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায় পরিবারের লোকজন। পরে তারা দরজা ভেঙ্গে মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় আমরা সুরতহাল প্রতিবেদন সম্পন্ন করেছি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এখনো পাইনি। তবে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে যেটা মনে হয়েছে, ছেলেটি হতাশায় ভুগতেন। ডিপ্রেশন যাকে বলে।