র্যাব কেন বিতর্কিত?
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) অপরাধ দমনে ভূমিকার পাশাপাশি নানা অভিযোগ ও সমালোচনার কারণে বিতর্কে রয়েছে। বিশেষ করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ বারবার আলোচনার কেন্দ্রে ছিল র্যাব।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কথিত ‘ক্রসফায়ার’ নামে পরিচিত অভিযানে বহু ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন সংগঠন র্যাবের বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আসছে।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাব ও এর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনায় আসে। এরপর থেকে র্যাবের কার্যক্রম, জবাবদিহি ও সংস্কার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
সমালোচকদের মতে, র্যাব কখনো কখনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে এবং বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর আচরণ করেছে। তবে র্যাব এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। বাহিনীটির দাবি, তারা সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং অভিযানে আইন মেনেই কাজ করা হয়।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ
সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘অ্যানকাউন্টার’। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, বহু ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের পর বা হেফাজতে থাকা অবস্থায় মানুষ নিহত হয়েছেন, যা বিচারবহির্ভূত হত্যার শামিল। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব বলছে, ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কৈফিয়তহীন এ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অন্তত ২ হাজার ৯৫৪ জন। এ হিসাব ২০০৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত।
আসক জানিয়েছে, সংবাদপত্র এবং নিজেদের তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতেই এ তালিকা করেছে তারা।
গুমের অভিযোগ
অনেক রাজনৈতিক কর্মী, বিরোধী দলের নেতা ও সাধারণ নাগরিক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় র্যাবের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ পরে ফিরে এলেও অনেকের খোঁজ আজও মেলেনি।
গুম-সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে এক হাজার ৮৩৭টি গুমের অভিযোগ পেয়েছে তারা। এর মধ্যে এক হাজার ৭৭২ অভিযোগ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এক হাজার ৪২৭ জন ভুক্তভোগী জীবিত উদ্ধার হয়েছেন বা ফেরত এসেছেন। ৩৪৫ ব্যক্তি এখনও নিখোঁজ।
নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু
র্যাব হেফাজতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা মৃত্যুর কারণ হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, র্যাব হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেমারধর ও শারীরিক নির্যাতন,দীর্ঘ সময় চোখ বেঁধে রাখা,পর্যাপ্ত চিকিৎসা না দেওয়া এবংভয়ভীতি ও মানসিক চাপ প্রয়োগের মতো অভিযোগ উঠেছে।কিছু ঘটনায় পরিবারগুলোর দাবি, আটক ব্যক্তিকে সুস্থ অবস্থায় তুলে নেওয়া হলেও পরে মৃত বা গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হস্তান্তর করা হয়।
মানবাধিকার লঙ্ঘন
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো র্যাবের বিরুদ্ধে বেআইনি আটক, আইনজীবী ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদ, ভয়ভীতি ও নিপীড়নের অভিযোগ তুলে আসছে।
রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ
সমালোচকদের দাবি, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে র্যাবকে ব্যবহার করা হয়েছে, বিশেষ করে নির্বাচন ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সময়।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব ও এর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এতে বাহিনীটির ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।