ছাত্রলীগ নেতার প্যারোলে মুক্তি নিয়ে কী ঘটেছিল?
বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ) সভাপতি সাদ্দামের স্ত্রী সন্তানকে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। এর আগে শনিবার ডাঙ্গা স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে রাত ১১টা ২০ মিনিটের দিকে তাদের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
সন্তান ও মায়ের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ জেলাজুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। কেউ কেউ দাবি করছেন, সাদ্দাম জেলে থাকায় অভাবের তাড়নায় তার স্ত্রী নিজের সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন। আবার কেউ দাবি করেছেন, সাদ্দাম পলাতক থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করায়, তার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন।
এছাড়া স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য সাদ্দামকে প্যারোলে কেন মুক্তি দেওয়া হল এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা সমালোচনার শেষ নেই।
তবে রবিবার সকালে সাদ্দামের বাড়িতে স্থানীয় বাসিন্দা ও তার পরিবারের লোকজনের ভিড় ছিল। সাদ্দামের বাড়িতে একতলা ভবন। সাদ্দামরা তিন ভাই ও তিন বোন। বাবা একরাম হাওলাদার মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। এক তলা এই ভবনে সাদ্দামের মা, এক বোন ও সাদ্দামের স্ত্রী-সন্তান থাকতেন। সাদ্দামের এক ভাই সরকারি চাকরি করেন, আরেক ভাই প্রকৌশলী তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
এই ভবনের সামনে দাড়িয়ে কথা হয় সাদ্দামের মা ও ছোট ভাই প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের সঙ্গে।
জানতে চাইলে সাদ্দামের মা দেলোয়ারা একরাম স্টার নিউজকে জানান, শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভাতিজীর বিয়েতে অংশগ্রহণের জন্য বাগেরহাট শহরের বগা ক্লিনিক এলাকায় যান। তখন পুত্রবধূ, নাতি, এক মেয়ে ও মেয়ের ছেলে বাড়িতে ছিল। পুত্রবধূ কানিজের সঙ্গে কথা ছিল, দুপুরের দিকে তিনিও ওই বিয়ে বাড়িতে যাবেন। কিন্তু ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে সাদ্দামের মাকে পাশের বাড়ি থেকে মুঠোফোনে জানানো হয়, তার পুত্রবধূ গলায় রশী দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। পরে তারা ছুটে যান।
সাদ্দামের মা আরও বলেন, ‘আমার খুব শান্তির সংসার, বউ মা ও নাতনিকে নিয়ে আমি থাকতাম বাড়িতে। বউমার সঙ্গে আমার খুবই ভাল সম্পর্ক। আমার সংসারে কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু কেন যে ও এমন করল জানি না।’
সাদ্দামের ভাই প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সংসারে কোনো অভাব-অনটন ছিল না। আর আমার ভাই দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, এমন কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। যারা এসব প্রচার করছেন, তারা হয়ত কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য করছেন।’
তিনি স্টার নিউজকে আরও বলেন, ‘ভাবি (কানিজ) আমাকে কয়েকবার বলেছেন যে দুই মাস হয়ে যায়, তার বাবা তাকে এবং তার ছেলেকে দেখতে আসেন না। এছাড়া অনেকে ভাবিকে বলেছেন, যে তার স্বামী (সাদ্দাম) আর কোনো দিন জেল থেকে বের হতে পারবেন না। এসব নিয়েও, ভাবির মধ্যে হতাশা ছিল।’
এদিকে শুক্রবার মারা যাওয়ার পরে সাদ্দামের স্ত্রী-সন্তানের মারা যাওয়ার পরে তার শ্বশুর রুহুল আমিন হাওলাদার বলেছিলেন তার মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এ নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু গতকাল শনিবার সাদ্দামের শ্বশুর রুহুল আমিন হাওলাদার বাদী হয়ে বাগেরহাট মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েকে হয়ত ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে, আর আমার নাতি কীভাবে মারা গেল, এটা জানার জন্য হত্যা মামলা করা হয়েছে। প্রশাসন যা ভাল মনে করেছে তাই করেছে। তদন্তের সঠিক বিষয় বেড়িয়ে আসবে।’
এদিকে নিহত কানিজের ভাই শাহনেওয়াজ আমিন শুভ বলেন, ‘আমার বোন আত্মহত্যা করার মত মানুষ না। সে আত্মহত্যা করতে পারে না। আমরা প্রথমে যদিও বলেছিলাম, সে আত্মহত্যা করেছেন, কিন্তু নানা বিষয় চিন্তা করে আমরা মনে করছি সে আত্মহত্যা করেনি। এছাড়া আত্মহত্যার পরে সাদ্দামের পরিবারের যে ব্যবহার তাতে মনে হয়েছে, কোনো সমস্যা আছে।’
সাদ্দামের দ্বিতীয় বিয়ে সম্পর্কে শুভ বলেন, ‘কয়েকজনের কাছে শুনেছি, সাদ্দামের দ্বিতীয় বিয়ের পরিবারের লোকজন সাদ্দামের বাড়িতে এসেছিল। এরপর থেকে আমার বোনের মন খারাপ ছিল।’
এ বিষয়ে বোনের সঙ্গে আপনার কথা হয়েছে কি-না এবং আপনাকে কে বলেছে এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘শুভ বলেন আমি শুনেছি। আর বোনও এ বিষয়ে আমার বোন আমাকে কিছু জানায়নি।’
এদিকে গতকাল শনিবার দুপুরে শনিবার দুপুরে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মা ও ছেলের মরদেহ সাবেকডাঙ্গা গ্রামে সুবর্ণার বাবার বাড়িতে আনা হয়। সেখানে গোছল শেষে বিকেল সোয়া ৪টার দিকে লাশবাহী গাড়িতে করে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয় তাদের মরদেহ। সেখানে স্ত্রী-সন্তানের লাশ শেষবারের মতো দেখেন সাদ্দাম।
কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মানবিক দিক বিবেচনা মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে জুয়েলের পরিবারের ছয় সদস্যকে কারা ফটকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।
কানিজ ও জুয়েল নিজেদের পছন্দের কয়েক বছর আগে বিয়ে করেন। সন্তানের জন্মের আগে থেকেই জুয়েল কারাগারে আছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন জুয়েল।
সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করা তার মামা হেমায়েত হোসেন স্টার নিউজকে বলেন, ‘আমি আবেদন করেছিলাম। জেলা প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, যেহেতু যশোর জেলে তাই আমাদের প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। পরে বাগেরহাটের জেল সুপারের সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি বলেছেন, আমাদের কোনো সুযোগ নেই, আপনারা যশোরে মরদেহ নিয়ে দেখা করিয়ে আসেন। পরে আমরা যশোরে দেখা করিয়েছে। সেখানেও মাত্র ৪-৫ মিনিট সময় দিয়েছে মাত্র।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদি জেলা প্রশাসন ও কারাগার থেকে যদি আমাদের বলা হত যশোরে আবেদন করেন তাহলে আমরা যশোরে আবেদন করতাম। কিন্তু আমাদের কেউ জানায়নি, যে যশোরে আবেদন করলে প্যারোলে মুক্তি দিতে পারে।’
প্যারোলের বিষয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন স্টার নিউজকে বলেন, ‘প্যারোলের একটি আবেদন নিয়ে আসছিল। তাদের বুঝিয়ে বলা হয়েছে। যেহেতু সে আছে যশোরের কারাগারে, আবেদন করতে হবে সেখানকার (যশোরের) জেলা প্রশাসক বা জেল সুপারের কাছে। তবে প্যারোলের ক্ষেত্রে মুক্তি পেলেন শুধু মাত্র ওই জেলার মধ্যে তার প্যারোলের হুকুমটা কার্যকর হবে। এখানকার প্রশাসন তাদের বিষয়ে যশোর জেলা কারাগারেও বলে দিয়েছিল। কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলেছিল, যেন সুন্দরভাবে, সঠিকভাবে তাদের মৃত স্বজনের লাশ দেখতে পারে। আমরা তাদের সেখানে যাওয়া এবং দেখার বিষয়ে সহযোগিতা করেছি।’
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ হাছান চৌধুরী বলেন, ‘মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে আমরা তদন্ত করছি। যেসব ধোঁয়াশা আছে সেগুলো তদন্তের বেড়িয়ে আসবে।’