যশোরে ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা: কেন ঘটেছিল এমন নৃশংসতা?
যশোরের মনিরামপুরে বরফকল ও ঘের ব্যবসায়ী হিসাবে বেশি পরিচিত রানা প্রতাপ বৈরাগী (৪৫)। স্থানীয় কপালিয়া ও আড়ুয়া বাজারে তার দুটি বরফকল ও মাছের আড়ত আছে তার। এলাকায় তিনি চরমপন্থি নেতা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকেলে প্রকাশ্যে গুলি করে তাকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেলে মুঠোফোনে কপালিয়া বরফকলের অদূরে ঝুম বিউটি পার্লারের সামনের গলিতে তাকে ডেকে নেয় তিন দুর্বৃত্ত। সেখানে তাদের সঙ্গে রানার বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে একজন প্রথমে রানা উদ্দেশ্য গুলি করেন কিন্তু সেটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পাশেই ক্লিনিকের জানালায় বিদ্ধ হয়। এরপর খুব কাছ থেকে রানার মাথায় তিন রাউন্ড ও বুকে এক রাউন্ড গুলি করে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে আরেকজন রানার গলা কেটে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।
পুলিশের ধারণা, প্রতাপের পূর্ব পরিচিতরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আজ মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত স্থান, স্বজন প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
রানা প্রতাপ বৈরাগীর বাড়ি যশোরের কেশবপুর উপজেলার আড়ুয়া গ্রামে। মনিরামপুর কপালিয়া বাজারে তার একটি বরফ তৈরির কারখানা আছে। কেশবপুরের কাটা-খালী বাজারে তার একটি মাছের আড়ত ও বরফকল আছে। এছাড়া তিনি নড়াইল থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বিডি খবর’ নামের একটি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন।
প্রথম গুলিটিলক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পাশেই ক্লিনিকের জানালায় বিদ্ধ হয়/স্টার নিউজ
মঙ্গলবার রাত ৮টা পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কেউ আটক হননি। এর আগে এ দিন বিকেলে নিহতের বাবা তুষার কান্তি বৈরাগী অজ্ঞাত আসামী করে মনিরামপুর থানায় মামলা করেছেন। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয়রা জানান, কেশবপুর উপজেলার আরুয়া গ্রামের স্কুল দম্পতি তুষার কান্তি বৈরাগী ও মাধুবি লতা বিশ্বাসের ছেলে নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগী। এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে রানা বড় সন্তান ছিলেন। ব্যবসার পাশাপাশি রানা এক সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর তিন উপজেলার সীমান্তে বাড়ি হওয়াতে আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে তার সখ্যতা ছিল। এক সময়ে জড়িয়ে পড়েন নিষিদ্ধ সংগঠন চরমপন্থি দলে। এলাকায় একটি বাহিনীও গড়ে ছিলেন তিনি। পুরনো পত্র-পত্রিকায় রানা প্রতাপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নানা খবর প্রকাশিত হয়েছে। যদিও বছর পাঁচেক স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আবারও শুরু করেন ব্যবসা ও সাংবাদিকতা। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে যান। হঠাৎ এমন নৃশংস হত্যার শিকার হওয়া নিয়েও জনমনে প্রশ্ন স্থানীয়দের।
রানা প্রতাপ বৈরাগী/ স্টার নিউজ
নাম না প্রকাশে বাজারের কয়েকজন জানান, রানা আগে (আন্ডার ওয়ার্ল্ডের) নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য ছিলেন। এলাকায় তার একটি বাহিনীও ছিল। তবে সেটা বছর দশেক আগে। পরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য প্রথমে জড়ান আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে। এরপর স্থানীয় বাজারে দুটি বরফ কলের মেশিন বসান। একে একে ঘের ও মাছের আড়তের ব্যবসা শুরু করেন। পদ-পদবী না থাকলেও তার বাসায় স্থানীয় এমপি, জনপ্রতিনিধিদের নিয়মিত যাতায়াত করতেন। ফলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বাড়িতে ভাংচুর করেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা। কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পরে সম্প্রতি নিজ এলাকায় ফেরেন তিনি। রানার দুই স্ত্রী পৃথক দুটি বাড়িতে বসবাস করেন।
তিন কারণে হত্যার শিকার রানা!
নৃশংসভাবে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে স্থানীয়, পরিবার ও পুলিশ তিনটি কারণ বলছে। প্রথমত, রানা বৈরাগী দুটি বিয়ে করার আগে স্থানীয় কাটা-খালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এক ছাত্রী ঝুমুরের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। এরপর তারা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যান। পরে ঝুমুরের অন্যত্র বিয়ে হলে তার স্বামী বিদেশে চলে যান। এরপরও ঝুমুরের সঙ্গে রানার সম্পর্ক বৃদ্ধি হয়। রানার বরফকলের ১০০ মিটার দূরে ঝুমুরের ‘ঝুম বিউটি পার্লার’ করতে সহযোগিতা করেন রানা। নিয়মিত রানা পার্লারে যাওয়া আসা ছিল। হত্যাকাণ্ড সংগঠিত স্থানও ঝুমুরের বিউটি পার্লারের সামনে।
স্থানীয়রা বলছেন, পরকীয়ার জেরে এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে। দ্বিতীয় কারণ হিসাবে রানা একসময় নিষিদ্ধ চরমপন্থি দলের কর্মী ছিলেন। সে একসময় ভবদহ ও খুলনার ডুমুরিয়া এলাকায় একটি বাহিনীও গড়ে তোলেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অপরাধীদের আটকে অভিযান, ক্রসফায়ার শুরু হলে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। ফলে চরমপন্থিদের পূর্ব শত্রুতার জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। তৃতীয় কারণ হিসাবে বলছেন, জিয়া নামে স্থানীয় ঘের ও বরফকল ব্যবসায়ীর সঙ্গে রানার দীর্ঘদিনের বিরোধ। বছর খানেক আগেও জিয়া রানাকে হত্যার জন্য নানা পরিকল্পনা করেছিলেন। একইসঙ্গে হুমকিও দিয়েছিলেন। সেই বিরোধে এই হত্যাকাণ্ড আশঙ্কা করছেন নিহতের পরিবার।
নিহতের প্রথম স্ত্রী সীমা মজুমদার স্টার নিউজকে বলেন, ‘আগেও জিয়া রানাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিছুদিন আগেও হুমকি দিয়েছে।’ ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্বে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।’
রানার দ্বিতীয় স্ত্রী পিংকি মল্লিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে স্টার নিউজকে বলেন, ‘আমার রানা রাজনীতি করলেও কারোও ক্ষতি করতো না। মানুষের উপকার ও বিভিন্ন ব্যবসা করে তার উন্নতি হওয়াতে এলাকায় কাল হয়ে গেছে। কী এমন অপরাধ করেছে, এমনভাবে তাকে মারতে হলো। আমার সন্তানের কী হবে, আমাদের কী হবে?’
নিহত রানার মা স্কুল শিক্ষক মাধুবি লতা বিশ্বাসের দাবি, এক সময়ে রাজনীতি করলেও বছর পাঁচ আগে ছেড়েছিলেন রানা। চরমপন্থি হিসাবে বিগত সময়ে পুলিশ তাকে ফাঁসিয়ে ছিলেন। অভিযোগ ব্যবসায়ী দ্বন্দ্ব নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে প্রতিপক্ষরা। পৈশাচিক এই হত্যার বিচার চান তিনি।
পুলিশ বলছে, রানা বৈরাগী বিরুদ্ধে অভয়নগর থানায় একটি হত্যা, ধর্ষণ ও কেশবপুর থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের তিনটি মামলা রয়েছে। ২০১৪ সালে অভয়নগর থানায় শ্রমিক নেতা ওলিয়ার হত্যা মামলায় চার্জশীটভুক্ত আসামি। পরে ২০২০ সালে এই একই থানায় তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে আরেকটি মামলা হয়।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবুল বাশার স্টার নিউজকে বলেন, ‘মঙ্গলবার বিকেলে নিহত রানার বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তুষার কান্তি বৈরাগী অজ্ঞাত আসামি করে মনিরামপুর থানায় মামলা করেছেন। নিহত রানার শরীরে বিদ্ধ হওয়া চারটি গুলির উৎস পরীক্ষা চলছে। একইসঙ্গে বিউটি পার্লারের মালিক ঝুমুরের সঙ্গে পরকীয়া, ব্যবসায়ীক দ্বন্দ্ব কিংবা চরমপন্থির পূর্বের কোনো বিরোধ রয়েছে কি-না, তা খোঁজতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। আশা করছি, এ হত্যার কারণ দ্রুত সময়ের মধ্যে উদঘাটন সম্ভব হবে।’