নিভে গেল এক অগ্নিশিখা
পরপারে পাড়ি জমালেন বীরাঙ্গনা যোগমায়া মালো
একটি জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মুক্তিযুদ্ধের নির্মম ইতিহাস, অসীম যন্ত্রণা আর সীমাহীন ত্যাগ। অবশেষে সব কষ্টের অবসান ঘটিয়ে পরপারে পাড়ি জমালেন শরীয়তপুরের বীরাঙ্গনা যোগমায়া মালো। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা ও দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে সোমবার (৫ জানুয়ারি) দুপুরে সদর উপজেলার মধ্যপাড়া এলাকার নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার মৃত্যুতে শরীয়তপুরজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বিকেলে তার অন্তিম যাত্রার আগে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা হিসেবে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ইলোরা ইয়াসমিনের নেতৃত্বে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই সম্মান জানানো হয়।
প্রসঙ্গত, ১৯৭১ সালের ২২ মে। শরীয়তপুর সদরের মনোহর বাজারসংলগ্ন দক্ষিণ মধ্যপাড়ার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় নেমে আসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব। ঘর থেকে তুলে আনা হয় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। তখন মাত্র ১৫ বছরের কিশোরী গৃহবধূ যোগমায়া মালোকেও স্বামী নেপাল চন্দ্র মালোর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় হানাদাররা। মধ্যপাড়ায় অনেক পুরুষকে গুলি করে হত্যা করার পর অন্তত ১০০ জন নারী-পুরুষকে লঞ্চে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় মাদারীপুরের এআর হাওলাদার জুট মিলে। সেখানে তিন দিন তিন রাত নারীদের ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। সেই বিভীষিকাময় অধ্যায় শেষে বেঁচে ফিরে এলেও আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়েছে মানসিক ক্ষত আর অসহনীয় যন্ত্রণার স্মৃতি।
স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৭ বছর পর ২০১৮ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে স্বীকৃতি পান যোগমায়া মালো। তবে স্বীকৃতি মিললেও জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তার ছিল না নিজের একটি নিরাপদ ঠিকানা। বিষয়টি গণমাধ্যমে উঠে আসার পর গত বছরের ডিসেম্বরে বিজয় দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাকে একটি পাকা ঘর করে দেওয়া হয়। সেই ঘরে কিছুদিন পরিবারের সান্নিধ্যে কাটানোর সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি, যা যেন ছিল জীবনের শেষ স্বস্তির ঠিকানা।
যোগমায়া মালোর মেয়ের জামাই সুভাষ দাড়িয়া বলেন, ‘আমার শাশুড়ি আজ দুপুর ২টার দিকে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। উপজেলা প্রশাসন তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দিয়েছে। সবাই তার আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করবেন।’
সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইলোরা ইয়াসমিন বলেন, ‘বীরাঙ্গনা যোগমায়া মালোর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। কিছুদিন আগে আমরা তাকে একটি সরকারি ঘর দিয়েছিলাম। আজ তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার যে ত্যাগ- তা এই জনপদ কখনও ভুলবে না।’
একজন বীরাঙ্গনা শুধু একজন নারী নন, তিনি ইতিহাস, তিনি আত্মত্যাগের প্রতীক। যোগমায়া মালো চলে গেলেন, রেখে গেলেন এক রক্তাক্ত স্মৃতি, যা আমাদের স্বাধীনতার মূল্য বারবার মনে করিয়ে দেবে।