Search

Search

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াল যুক্তরাষ্ট্র, কী কী আছে সেই বহরে?

মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন | ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে এবার মধ্যপ্রাচ্যে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে গেল জুনে এভাবেই ওই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছিল দেশটি। তার কিছুদিন পরই ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের তিনটি পরমাণু স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়।

তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। গেল ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ইরানে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলনে চলতি মাসে প্রকাশ্যে সমর্থন দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান সরকারের দমনপীড়নের মুখে জানান, বিক্ষোভকারীদের জন্য সাহায্য আসছে। যদিও গত সপ্তাহে সুর কিছুটা নরম করেন ট্রাম্প।

এর মধ্যে ইরানেও আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে। তারপরও ঠিক এখনই কেন উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক অ্যাসেট পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র? তাহলে কী ইরানে আবারও হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি? ঘুরে ফিরছে এমন প্রশ্নও।

কেন মধ্যপ্রাচ্যে রণতরী পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?

ট্রাম্প বৃহস্পতিবার বলেন, একটি মার্কিন ‘আর্মাডা’ উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে যাচ্ছে। ইরানের কথা মাথায় রেখেই ওই বহর পাঠানো হচ্ছে বলেও জানিয়েছিলে তিনি। মার্কিন কর্মকর্তারাও তখন জানান, খুব শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্যে একটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ও অন্যান্য অ্যাসেট গিয়ে পৌঁছবে।

‘আমরা ইরানের ওপর নজর রাখছি। আমাদের বড় একটি বাহিনী ইরানের দিকে যাচ্ছে।’ বলেন ট্রাম্প। তিনি আরও বলেন, হয়ত এগুলো আমাদের ব্যবহার করতে হবে না। ওই অঞ্চলে আমাদের অনেক জাহাজ যাচ্ছে। আমরা সেদিকে একটি বড় নৌবহর পাঠিয়ে রাখছি। দেখা যাক কী হয়।


এক সপ্তাহের বেশি সময় আগে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা হয় বিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিংকন। এই ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের সঙ্গে রয়েছে আরলেইঘ বার্ক ক্লাসের ডেস্ট্রয়ার। এসব ডেস্ট্রয়ারে রয়েছে টমাহক ক্রুজ মিসাইল, যেগুলো দিয়ে ইরানের একেবারে ভেতরেও হামলা চালানো সম্ভব।

ওই বহরে থাকা যুদ্ধজাহাজে রয়েছে অ্যাজিস কমব্যাট সিস্টেম। এই ব্যবস্থা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইলসহ আকাশপথের যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম। গেল জুনে ইরানের পরমাণু স্থাপনা লক্ষ্য করে সাবমেরিন থেকে ৩০টি টমাহক মিসাইল ছুড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি বি-2 বোমারু বিমান দিয়েও হামলা চালানো হয়েছিল।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ক্ষমতাচ্যুত করাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কিনা ট্রাম্পের কাছে বৃহস্পতিবার তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেন, আমি তেমন কিছু করতে চাই না, কিন্তু তারা জানে আমরা কী চাই। অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। পাশাপাশি ট্রাম্প দাবি করেন, তার কারণে আট শতাধিক মানুষের মৃত্যুদণ্ড রহিত করেছে ইরান। যদিও ইরানি কর্মকর্তা ট্রাম্পের এই দাবি অস্বীকার করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোরও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিকে ইরানি হামলা থেকে রক্ষা করতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া এখন পর্যন্ত সরকারবিরাধী বিক্ষোভে ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে কবে থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা রয়েছে?

দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ থেকে ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের তথ্যমতে, এই অঞ্চলের অন্তত ১৯টি স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে বাহরাইন, মিশর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ৮টি স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে।


১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে বৈরুতে যুদ্ধের জন্য সৈন্য পাঠিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথমবারের মতো সেনা মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। একপর্যায়ে লেবাবনে মার্কিন সেনার সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজারে পৌঁছায়।

মজার বিষয় হচ্ছে, নৌবাহিনীকে কোথায় কোথায় মোতায়েন রাখা হবে, তা নির্ধারণ করে শুক্রবার একটি নতুন জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতি চার বছর পর পর মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই কৌশল তৈরি করে। নতুন এই নিরাপত্তা নকশায় বিশ্বের অন্য প্রান্তে থাকা মার্কিন বাহিনীকে সরিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পশ্চিম গোলার্ধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ইরান?

ইরানের সেনা ও ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান সমন্বয়ক আলি আব্দোল্লাহি আলিয়াবাদি বৃহস্পতিবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, দেশটির ওপর যেকোনো ধরনের সামরিক হামলা হলে এই অঞ্চলে থাকা সব মার্কিন ঘাঁটি তেহরানের ‘বৈধ টার্গেটে’ পরিণত হবে। এর দুই দিন পর বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর বলেন, ইরান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রস্তুত, ট্রিগারেই রয়েছে আঙুল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘কোনো ধরনের ভুল হিসাব-নিকাশ এড়িয়ে’ চলারও পরামর্শ দেন তিনি। চলতি মাসেই মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ঘাঁটি থেকে নিজেদের কিছু সেনা প্রত্যাহার করে নেয় ওয়াশিংটন। হামলা হলে ইরান পাল্টা হামলার হুমকির দেওয়ার পর ওয়াশিংটন এমন পদক্ষেপ নেয়।


দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে মঙ্গলবার এক লেখায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, যদি হামলা করা হয়, তাহলে ‘যা কিছু আছে, তার সবটা দিয়ে’ তেহরান জবাব দেবে বলে জানান তিনি। আরাগচির ভাষায়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তার প্রক্সিদের দিয়ে যে স্বপ্ন দেখছে, সর্বাত্মক সংঘাতে সেটি অনেক বেশি ভয়ংকর হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় কতখানি প্রভাব পড়েছে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনার কারণে ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় এর প্রভাব পড়েছে। কিছু ফ্লাইট এরই মধ্যে স্থগিত করা হয়েছে। সপ্তাহান্তে এয়ার ফ্রান্স প্যারিস থেকে দুবাইগামী দুটি ফ্লাইট বাতিল করে। পরে অবশ্য ফ্লাইট পুনরায় চালু করে এয়ার ফ্রান্স। লুক্সএয়ার শনিবার লুক্সেমবার্গ থেকে দুবাইগামী সব ফ্লাইট ২৪ ঘণ্টার জন্য পিছিয়ে দেয়। এছাড়া নেদারল্যান্ডসের কেএলএম ও ট্রান্সসাভিয়াও আমস্টারডাম থেকে মধ্যপ্রাচ্যে কিছু ফ্লাইট শুক্র ও শনিবার বাতিল করে।

ইরানের ওপর কী নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র?

তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি শুক্রবার ইরানের ৯টি জাহাজ ও সেগুলোর মালিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে বিদেশি মার্কেটে শত শত কোটি ডলারের ইরানি তেল অবৈধভাবে সরবরাহ করছে এই জাহাজগুলো।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, দেশজুড়ে বিক্ষোভের সময় ইরান তার নাগরিকদের ওপর যে নিপীড়ন চালিয়েছে, তা লুকাতে ইন্টারনেট অ্যাকসেস বন্ধ করে দেওয়ায় এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ইরান তার নিজ দেশের জনগণের ওপর নিপীড়ন চালাতে যে অর্থ যোগান পায়, সেটি টার্গেট করতেই এই নিষেধাজ্ঞা। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার আত্ততায় পড়া জাহাজগুলো পালাউ, পানামা ও অন্য দেশের পতাকা ব্যবহার করে রাশিয়া ও ইরান থেকে মালামাল চোরাচালান করছিল।

> আল জাজিরা থেকে ভাষান্তর করেছেন আহাম্মদ উল্লাহ সিকদার

সম্পর্কিত খবর :