যুক্তরাষ্ট্রে আতঙ্ক-অনিশ্চয়তায় অভিবাসীরা
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি ও লাগাতার অভিযানে নাকাল দেশটিতে বসবাসরত অভিবাসীরা। গ্রেপ্তার ও নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আতঙ্কে অনিশ্চিত জীবন। ঘর থেকে বাইরে যাওয়াই বন্ধ করেছেন অনেকে। বন্ধ হয়ে গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য, বাড়ছে আর্থিক সংকট। সেইসঙ্গে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে নতুন অভিবাসী গ্রহণের দরজাও বন্ধ করেছেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার মিনিয়াপলিস শহরের সেন্ট পল এলাকায় বাঁশি বাজিয়ে রাস্তায় টহল দিচ্ছেন এলাকাবাসী। চোর বা ডাকাত তাড়াতে নয়। বরং পুলিশের গ্রেপ্তার এড়াতেই এমন তৎপরতা। তাদের নতুন আতঙ্ক এখন আইসিই এজেন্ট।
সম্প্রতি মিনিয়াপলিসে আইসিই এজেন্টদের গুলিতে এক নারী নিহত হওয়ায় বেড়েছে আতঙ্ক। বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো শহর।
গত বছরের ডিসেম্বরে মিনিয়াপলিস শহরজুড়ে ব্যাপক অভিযান চালায় ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস অ্যানফোর্সমেন্ট্রের অ্যাজেন্টরা। তাদের লক্ষ্য অবৈধ সোমালি অভিবাসীদের গ্রেপ্তার। শুধু অবৈধ নয়। এমন অভিযানে আটক হচ্ছেন বৈধরাও।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপলিসের অভিবাসী ও শরণার্থী-বিষয়ক কার্যালয়ের পরিচালক মিশেল রিভেরো বলেছেন, ‘পুরো মিনিয়াপলিসজুড়ে এই অভিযান চলছে। আমাদের কাছে গ্রেপ্তারের একাধিক রিপোর্ট এসেছে। এতে মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু অবৈধ নয় যারা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেছেন, যারা বৈধভাবে এই দেশের নাগরিক তাদের মাঝেও এমন আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে।’
গ্রেপ্তারের ভয়ে ঘর থেকে বের হওয়াই বন্ধ করে দিয়েছেন সোমালি অভিবাসীরা। উপার্জনের একমাত্র উৎস দোকান-পাট বন্ধ করে গৃহবন্দী হতে বাধ্য হয়েছেন তারা। আর্থিক সংকট ও আতঙ্কের মধ্যে অনিশ্চিত জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের।
এক সোমালি অভিবাসী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আইসিই এজেন্টরা সব জায়গায় আছে। তারা শুধু অবৈধ নয় সকল সোমালি অভিবাসীদেরই টার্গেট করেছে। আমরা কেউ ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছি না। আমাদের দোকান-পাট, ব্যবসা বাণিজ্য সব বন্ধ। দোকান খুললেও কোনো ক্রেতা নেই। কেউ ভয়ে আমাদের দোকানে আসে না। আমি আমার ব্যবসা বন্ধ করতে চাই না।’
এমন দৃশ্য পুরো যুক্তরাষ্ট্রে। এই আতঙ্ক শুধু সোমালিদেরই নয় বরং সকল অভিবাসীর।
দ্বিতীয়বারের মত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পরই অভিবাসী নিয়ন্ত্রণের নীতি নিয়েছেন ট্রাম্প। ‘প্রটেকটিং দ্যা আমেরিকান পিপল অ্যাগেইন্সট ইনভেশন’ শীর্ষক নির্বাহী আদেশে সই করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ট্রাম্পের এই বিতর্কিত পদক্ষেপ।
এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম নয় মাসে দুই লাখ ২০ হাজার অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার অভিবাসীর কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই।
অভিযানের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত পথে বিদায়ী বছরে সবচেয়ে কম অভিবাসী প্রবেশের চেষ্টা করেছে। যা যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
মার্কিন কাস্টমস এবং সীমান্ত সুরক্ষা দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে সীমান্তে অবৈধ প্রবেশের সময় দুই লাখ ৩৮ হাজার অভিবাসীকে আটক করা হয়। এর মধ্যে, মেক্সিকোর নাগরিক সর্বোচ্চ ৪৭ শতাংশ, গুয়েতেমালা ১৩ শতাংশ, হন্ডুরাস ৭ শতাংশ, কলম্বিয়ার ৫ শতাংশ, ভেনেজুয়েলা ৪ শতাংশ, এল সালভাদর ৩.২৯ শতাংশ, ইকুয়েডর ৩.২৭ শতাংশ এবং অন্যান্য ৩.২৭ শতাংশ।
২০২৫ সালে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে স্থায়ীভাবে অভিবাসী নেওয়া বন্ধের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। ইতোমধ্যে ১৯টি দেশ থেকে ভিসা আবেদন ও শরণার্থী আবেদন স্থগিত করা হয়েছে। এই তালিকায় আছে আফগানিস্তান, মিয়ানমার, ইরান, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান ও ইয়েমেনের মতো দেশগুলো।
তালেবান শাসন থেকে পাকিস্তানে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পুনর্বাসনের আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করা আফগানদের যুক্তরাষ্ট্রে থিতু হবার পথও বন্ধ হয়ে গেছে। তবে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।