যশোরেও এলপিজি গ্যাসের সংকট, দামও বাড়তি
সারা দেশের মতো যশোরেও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকট দেখা দিয়েছে। সরবরাহ স্বল্পতার কথা বলে সংকটকে সামনে আনছেন বিক্রেতারা। তবে বাড়তি দামেও গ্যাস মিলছে বলে অভিযোগ ভোক্তাদের।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে যশোরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় এমন চিত্র।
যশোরের গরীব শাহ এলাকার বৃহৎ এলপিজি গ্যাসের দোকান কাদের এন্টারপ্রাইজ। সরেজমিনে দেখা যায়, দোকানের ম্যানেজার-বিক্রয়কর্মী সবাই মোবাইল ফোনে ভিডিও দেখে অলস সময় পার করছেন। এ সময় পিছনে গ্যাসের সিলিন্ডার বাঁধা একটি মোটরসাইকেলে চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি এসে দাঁড়ালেন দোকানের সামনে। দাঁড়িয়েই দোকানদারের কাছে জানতে চাইলেন গ্যাস আছে কি-না। প্রতিউত্তরে দোকানদার জানালেন, কোনো গ্যাস নেই।
হতাশা আর ক্লান্তি নিয়ে ওই ক্রেতা চলে যাচ্ছিলেন অন্য দোকানের উদ্দেশে। যাওয়ার আগে তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। জানালেন তার নাম আলমগীর হোসেন, থাকেন শহরের মণিহার এলাকায়।
আলমগীর স্টার নিউজকে জানান, গত দুই দিন ধরে তার বাসায় কোনো গ্যাস নেই। বাসার পাশের এক দোকান থেকে নিয়মিত গ্যাস নিলেও সেখানে গ্যাস না থাকায় বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শহরে গ্যাস খুঁজে বেড়াচ্ছেন তিনি। শুক্রবার সকাল থেকে মোটরসাইকেলের পিছনে সিলিন্ডার বেঁধে শহরে গ্যাস খুঁজছেন। নন-ব্র্যান্ডের কিছু গ্যাস পাওয়া গেলেও, পাচ্ছেন না তার পূর্বে ব্যবহৃত বসুন্ধরা সিলিন্ডার। নন-ব্র্যান্ডের নিতে হলে নতুন করে কিনতে হবে সিলিন্ডারও। দাম দুই হাজার ৮০০ টাকা। তাই বাধ্য হয়ে তিনি মোটরসাইকেলে করে ঘুরে ঘুরে আগের ব্যবহৃত গ্যাস খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
পরিবেশক ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় তারা বাজার সামলাতে পারছেন না। এ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে।
পরিবেশক সূত্রে জানা গেছে, গোটা যশোর শহরে এলপিজির এক লাখ চাহিদা থাকলেও বর্তমানে ২৫ হাজার সিলিন্ডার মিলছে। বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ওমেরা, নাভানা, যমুনা, টিএমএসএসের মতো ব্র্যান্ডের এলপি গ্যাসের ওপরে ভোক্তা পর্যায়ে নির্ভরতা বেশি থাকলেও সরবরাহ না থাকায় শহরের সর্বত্র এ গ্যাসের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে সেনা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম, সানসহ ননব্র্যান্ড কিছু গ্যাস কোম্পানির সরবরাহ করা গ্যাসে পুরো শহরে সরবরাহ চলছে।
পরিবেশক পর্যায়ে ২ জানুয়ারি পর্যন্ত এক হাজার ২৫০ টাকায় গ্যাস বিক্রি হয়। আমদানি স্বল্পতায় এরপর তা বাড়িয়ে এক হাজার ৩৭০ টাকা করা হয়। তবে হাত বদলের পরে খুচরা পর্যায়ে শহরের সর্বত্র ১২ কেজির প্রতিটি এলপিজি এক হাজার ৩৭০ টাকার পরিবর্তে ১৬০০ থেকে দুই হাজার টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে বাড়তি দামে গ্যাস বিক্রির কারণে শহরের সর্বত্র ভোগান্তি বেড়েছে ভোক্তাদের। বাড়তি দামের কারণে গ্যাস কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
যারা এলপি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, রান্নার অন্য মাধ্যম নেই, তারা গ্যাসের সংকট ও বাড়তি দামের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। অনেকেই দোকানে গিয়ে গ্যাসের বাড়তি দাম শুনে চলে আসছেন, আবার কেউবা বিদ্যুৎ চালিত চুলা ও মাটির চুলায় রান্না সারছেন।
শহরের ওয়াপদা গ্যারেজ মোড় থেকে আসা মুর্শিদা বেগম স্টার নিউজকে বলেন, ‘গতকাল রাতে রান্নার মাঝ পথে গ্যাস শেষ। সকাল থেকে মোড়ে মোড়ে গ্যাস খুঁজে বেড়াচ্ছি, পাচ্ছি না। আগে কাঠের চুলা থাকলেও এখন গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা থাকায় গ্যাস ছাড়া রান্না করতে পারছি না।’
শহরের মাইকপট্টি এলাকার চা-দোকানি আমির হোসেন জানান, পেট্রোম্যাক্স গ্যাস ১৬০০ টাকায় কিনেছেন। বিক্রেতা পরিচিত হওয়ায় ওই দামে দিয়েছে। কিন্তু অন্যদের কাছে আরও বেশি দামে বিক্রি করছে। প্রশাসন জরিমানা করলে সেই টাকা তুলতে বিক্রেতারা আরও দাম বাড়িয়ে দেয়।
সিটি কলেজপাড়ার আছিয়া খাতুন বলেন, ‘চার দিন আগে ১৫০০ টাকায় সিলিন্ডার কিনেছি। আমার মতো যারা শুধু গ্যাসই ব্যবহার করেন, তারা অত্যন্ত বিপদে রয়েছেন। মাটির চুলা, স্টোভ বা বিদ্যুৎ চালিত চুলা সবার ঘরে নেই।’
এদিকে, গরীবশাহ সড়কের গ্যাস সরবরাহকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন স্টার নিউজকে বলেন, ‘সরবরাহ নেই। অন্য ছুটির দিনে ৮০-৯০টি সিলিন্ডার বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতাম। আজ ছুটির দিনে চাহিদা থাকলেও দিতে পারছি না।’
গরীবশাহ এলাকার কাদের এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সাজ্জাদ অর্ণব স্টার নিউজকে বলেন, ‘গত জানুয়ারি থেকে সংকটের শুরু হয়। ডিলাররা ১৩০৬ টাকার গ্যাস ১৩৭০ টাকায় বিক্রি শুরু করেন। ফলে খুচরা পর্যায়ে দাম ১৪০০ থেকে ১৪৩০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। কিন্তু এর মধ্যে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক খুচরা ব্যবসায়ী ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত দাম নিচ্ছেন। এটি প্রশাসনের দেখা দরকার।’
আর সরবরাহ সঙ্কট নিয়ে ডিলাররা বলছেন, তারা কোম্পানি থেকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না। আবার সরবরাহও দেরিতে করা হচ্ছে। ফলে তাদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ডিলার পর্যায়ে দাম বাড়ানোর ব্যাপারে কোম্পানিগুলোও সদুত্তর দিচ্ছে না। তাই সবমিলিয়ে এলপিজি গ্যাস নিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, গত ডিসেম্বর মাসজুড়ে শহরের বিভিন্ন খুচরা দোকানে ১২ কেজির প্রতিটি এলপি গ্যাস সার্ভিস চার্জসহ বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৩৫০ টাকার মধ্যে। পরে সরকারি রেট অনুযায়ী ১২ কেজির এলপিজি এক হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণের প্রতিবাদে ধর্মঘট ডাকেন রাজধানীর গ্যাস পরিবেশকরা। যার প্রভাব পড়ে খুচরা পর্যায়ে।
৮ জানুয়ারি এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড রাজধানীতে এলপিজি বিপণন ও সরবরাহে ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহার করে। তবে ধর্মঘট প্রত্যাহার হলেও যশোরের বাজারে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। সংকটের কারণে বাড়তি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।