Search

Search

ভারী অস্ত্র হাতে সীমান্তে ওরা কারা?

ছবি: স্টার নিউজ
বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত ২৭১ কিলোমিটার। এই পুরো সীমান্ত এখন নিয়ন্ত্রণ করছে মিয়ানমারের বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এদের অন্যতম আরাকান আর্মি। কিন্তু কারা এই আরাকান আর্মি? কী চায় তারা?

স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০০৯ সালে কাচিন ইন্ডিপেনডেন্ট আর্মির সহায়তায় গড়ে ওঠে আরাকান আর্মি। ২০১৫ সালে পালেতোয়া টাউনশিপে শুরু হয় তাদের সামরিক তৎপরতা। ২০২১ সালে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের যুদ্ধ শুরুর পর আরাকান আর্মিও জড়ায় এই যুদ্ধে। ২০২৩ থেকে ২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সেনাদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর রাখাইন রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টিই দখল করে নেয় আরাকান আর্মি।

সরেজমিনে দেখা যায়, নিজেদের দখল করা অঞ্চলগুলোতে সশস্ত্র তৎপরতা বাড়িয়েছে আরাকান আর্মি। তাদের প্রত্যেকের হাতে হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র। অস্ত্রের ফুটেজ যোদ্ধাদের অধিকাংশই তরুণ যুবক ও কিশোর। এই কিশোরদের হাতে একে ফরটি সেভেন রাইফেল। এই অস্ত্র ব্যবহার হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু এটি এখন নেহাত কিশোরদের হাতে।

বান্দরবানের সীমান্তজুড়ে রয়েছে আরাকান আর্মির ঘাটি। এক থেকে দেড় কিলোমিটার পর পরই কোনো না কোনো ঘাটি। এসব ঘাঁটিতে অস্ত্র হাতে ২৪ ঘণ্টা পাহারায় থাকেন আরাকান আর্মির যোদ্ধারা। ঘাটির চৌকিগুলোতে দেখা যায় তাদের পতাকা। একটি ঘাটিতে চোখ পড়ে স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দলের। সেখানে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন তরুণ যুবকের আনাগোনা। কিন্তু তাদের প্রায় সকলেই পঙ্গু। কারও হাত নেই। কারও বা পা।

আরাকান আর্মির একটি সূত্র বলছে, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে অঙ্গ হারানো তরুণদের রাখা হয়েছে এসব ক্যাম্পে। এ ঘাঁটিটি ব্যবহার হচ্ছে ওদের পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু বাংলাদেশের গা ঘেঁষে যখন এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা; তখন প্রশ্ন উঠেছে দেশের নিরাপত্তা নিয়ে। কারণ আরাকানিদের এই তৎপরতা কেবল তাদের দখল করা ভূখণ্ডের ভেতরই সীমাবদ্ধ নেই। সীমান্তের নজরদারি এড়িয়ে প্রায়ই তারা ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশে।

এছাড়াও তারা বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে পুতে রাখছে নীরব ঘাতক মাইন। সেই মাইন বিস্ফোরণে হতাহত হচ্ছেন বাংলাদেশিরা। বিজিবির টহলের জন্যেও ঝুঁকির কারণ হয়েছে এই মাইন। অথচ এভাবে প্রাণঘাতী মাইন পেতে রাখাটা আন্তর্জাতিক আইনে পুরোপুরি নিষিদ্ধ।

গত এক বছরে মাইন বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন অন্তত ২৬ জন বাংলাদেশি। নিহত হয়েছেন একাধিক। গত অক্টোবরে মারা গেছেন এক বিজিবি সদস্য। মাইন বিস্ফোরণের বেশি ঘটনা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে। হতাহতের সংখ্যাও এখানে বেশি।

তাদেরই একজন বান্দরবানের ঘুমঘুমের বাসিন্দা হাসান। সীমান্তের কাছেই তার চাষের জমি। সেই জমিতে গরু আনতে গিয়েই মাইন বিস্ফোরণে উড়ে যায় হাসানের একটি পা। সেই হাসানের জীবন এখন দুর্বিষহ। তিনি বলেন, ‘রাতে এরা (আরাকান আর্মি) বাইরে চলে আসে। আমি যেখানে আক্রান্ত হয়েছি, সেই জায়গাটা সীমান্ত (তারকাটার বেড়া) থেকে ১০০-১৫০ মিটার ভেতরে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিনই আতঙ্ক, প্রতিদিন রাতেই এরা গোলাগুলি করে। এই কিছুদিন আগেও প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টার মতো গোলাগুলি হয়েছে।’

২০২৩ সাল থেকে রাখাইন রাজ্যে জান্তা সরকারের সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে আরাকান আর্মি। এই রাজ্যকে ঘিরে একটি স্বাধীন আরাকান ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে চায় তারা। রাজ্যটির বেশিরভাগই এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। এরপর থেকেই বাংলাদেশের সীমান্তে বেড়েছে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা।

এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, ‘মাইন পুতে রাখার যে আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী আছে, সেগুলো এখানে (বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত) একেবারেই ফলো করা হচ্ছে না। ফলে এটা আমাদের বেসাময়িক জনগোষ্ঠীর জন্য জীবনের ওপর হুমকি। নিরাপত্তা নিয়ে যে ধরনের পরিস্থিতি থাকা দরকার, আমাদের সীমান্ত অঞ্চলে সেটা বিঘ্নিত হচ্ছে। কাজেই আরাকান আর্মির কর্মকাণ্ড আমাদের জন্য একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বা হুমকি হিসেবে আছে।’

১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের মাইন নিষিদ্ধকরণ চুক্তিতে সই করেনি মিয়ানমার। সেই সুযোগটাই লুফে নিয়েছে আরাকান আর্মি। দেশটির সামরিক বাহিনী থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠী; একে অন্যকে দমন করতে বাড়িয়ে দিয়েছে মাইনের ব্যবহার। সীমান্তের ওপাড়ে আরাকান আর্মির ‍সঙ্গে সংঘাত চলছে অন্য গোষ্ঠিগুলোরও। তাদের অভ্যন্তরীন সংঘর্ষের গোলা-বারুদ এসে পড়ছে বাংলাদেশের সীমানায়। গোলাগুলির সময় গ্রামবাসীকে বাড়িঘর ছেড়ে যেতে হয় নিরাপদ আশ্রয়ে।

স্থানীয়রা বলেন, ‘এখানে আসে রাত্রেবেলা। যখন ওদিকে গুলাগুলি হয়, এদিকেও এসে পড়ে। তখন আমরা খুবই আতঙ্কের মধ্যে থাকি।’

এতো গেলো স্থল সীমান্তের কথা। নাফ নদীর জলসীমার অবস্থা তাহলে কেমন? বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত ভাগাভাগি করেছে নাফ নদী। প্রায় ৬২ কিলোমিটারের এই পানি পথেও ঘাটে ঘাটে নিরাপত্তাহীনতা। কয়েক মাস আগে নদী থেকে পাঁচজন জেলেকে ধরে নিয়ে যায় আরকান আর্মি। এর মধ্যে একজনের গুলিবিদ্ধ মরদেহ পাওয়া গেলেও বাকি চারজনের হদিস এখনো মিলেনি।

এক জেলের সঙ্গে নাফ নদীতেই কথা হয় স্টার নিউজের। মাছ ধরাই তার জীবীকা। কিন্তু দিন দিনই বাড়ছে তাদের নিরাপত্তা ঝুকি। ভয়ে তটস্ত থাকতে হয় সারাক্ষণ। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগেও ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে গুলি করেছে। মাছ ধরেই আমাদের পরিবারকে চালাতে হয়, তাই বাধ্য হয়েই মাছ মারতে আসি।’

কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালীর আঞ্জুমানপাড়া। এই পাড়ার পাঁচজন জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মী। তাদের একজন ইউছুফ। বছর খানেক আগে নাফ নদীতে মাছ ধরতে গেছেন। কিন্তু আর ফিরে আসেননি। সেই থেকে ছেলের অপেক্ষায় দিন কাটে মায়ের। স্মৃতি হিসেবে আছে একটি ছবি, সেটিও পেয়েছেন মাস ছয়েক পর। ছবি দেখলেই বিলোপ করে কাঁদতে শুরু করেন তিনি।

কাঁদতে কাঁদতে সেই মা স্টার নিউজকে বলেন, ‘প্রতিবেশীরা বলেছেন, বিজিবির কাছে নালিশ করতে গেলে যারা ধরে নিয়ে গেছে তারা ছেলেকে মেরে ফেলবে। তাই আমি যাইনি, ছেলে ফিরে পাওয়ার আশায় আর যাইনি।’

পাশের বাড়ির সৈয়দুল বশর। তিনিও গিয়েছিলেন নাফ নদীতে মাছ ধরতে। তার গুলিবিদ্ধ মরদেহ পেয়েছে পরিবার। কিন্তু বাকিদের কোন খোঁজ মেলেনি। তার ভাই স্টার নিউজকে বলেন, ‘প্রথমে তারা ডাক দেয়, ডাকার পরে গুলি করে। গুলি করার পরে চারজনকে নিয়ে যায়। একজনের লাশ পাওয়া যায় দুই দিন পর।’

তথ্য বলছে, গেলো এক বছরে নাফ নদী থেকে সাড়ে ৩০০-এর বেশি জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। বিজিবির সাহায্যে স্বজনদের কাছে ফিরে আসে ২০০ মানুষ। বাকি ১৫০ জনের বেশি জেলের কোনো হদিস নেই। তারা কোথায় আছে কেমন আছে জানারও কোনো উপায় নেই। তবে মাঠ পর্যায়ে বিজিবির চেষ্টারও কমতি নেই।

এ বিষয়ে রামুর সেক্টর কমান্ডার (বিজিবি) কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ স্টার নিউজকে বলেন, ‘মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর যে ক্যাম্প আছে, সেই ক্যাম্পগুলোতে এখন আরাকান আর্মি অবস্থান নিয়েছে। যেহেতু সীমান্ত নদীর মধ্যে পড়েছে তাই আমাদের জেলেরা অনেক সময় ভুল করে মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি বা ওদিকে চলে যায়। তখন মিয়ানমার আর্মি বা মিয়ানমার নেভি অনেক সময় আরাকান আর্মি আমাদের জেলেদের ধরে নিয়ে যায়।’

কিন্তু কীভাবে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবে বাংলাদেশ? দ্বন্দ সংঘাত যাই থাকুক, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের যোগাযোগের নানা উপায় থাকে। থাকে কুটনৈতিক চ্যানেল। কিন্তু আরাকান আর্মি এখন রাষ্ট্রহীন এক গোষ্ঠি। কুটনীতির ভাষায় ‘নন স্টেইট এক্টর’। যাদের রাজনৈতিক বা সামরিক নেতৃত্বটাও বিশ্বের কাছে স্পষ্ট নয়। ওদের তৎপরতার অনেকটাই গোপনীয়তার পর্দায় ঢাকা। বিজিবিও শিকার করেছে, মাঠপর্যায়ে আনঅফিসিয়াল যোগাযোগ রাখতে হয় তাদের সঙ্গে।

এ বিষয়ে ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, ‘আরেকান আর্মির সঙ্গে আমাদের ফরমাল যোগাযোগটা নেই। কারণ যেহেতু তারা কোনো সরকারি বাহিনী না কিন্তু ইনফরমাল কিছু যোগাযোগ আছে। যদি ভুল করে কিংবা ইচ্ছা করে কেউ ঢুকে যায় বাংলাদেশের ভিতরে আমরা পুশব্যাক করে দেই।’

আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, ‘বাস্তবে মাঠ পর্যায়ে যে পরিস্থিতি আছে সেটাকে আমাদের অনুধাবন করতে হবে। তাদের সঙ্গে একটা সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করে, তারা কিন্তু যোগাযোগটা করতো। কিন্তু বর্তমানে আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে এক ধরনের মনোভাব প্রকাশ করা হয়েছে যে, “আমরা এখন রাষ্ট্রের সমান প্রায়। কাজেই আমাদের যোগাযোগ এই মাঠ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে রাখতে চাই না।” আমাদের এ ব্যাপারে আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি এখনই নির্ধারণ করতে হবে। আমরা কীভাবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবো? কীভাবে আমাদের সম্পর্কটা আমরা পরিচালনা করবো।’

আরাকান আর্মিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে বাহিনীটির প্রধান তুন মিয়াত নাইংয়ের সাক্ষাতকার চেয়ে কয়েক দফা ই-মেইল করার পর তারা অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেয়নি। তবে আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এসব অভিযোগ একপাক্ষিত। সীমান্তে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মাইন পুতে রাখে বলে উল্টো অভিযোগ করেন তারা।


সম্পর্কিত খবর :