Search

Search

ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

পাইলটদের লাইসেন্স দেন যারা, তাদেরই নেই লাইসেন্স

ছবি: স্টার নিউজ
শৈশবে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখেন প্রায় সবাই। কিন্তু বাস্তব জীবনে আকাশে ওড়ার জন্য প্রয়োজন কঠোর প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা এবং বৈধ লাইসেন্স। আশ্চর্যের বিষয় হলো- যারা পাইলটদের লাইসেন্স দেন তাদের নিজেরই লাইসেন্স নেই। কথাটি শুনতে অবাক লাগলেও সিভিল অ্যাভিয়েশনে লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়া ইন্সপেক্টরদের দিয়েই চলছে পাইলট লাইসেন্স সুপারিশের কাজ। যাদের এক-একজনের বয়স ৭০ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে।

স্টার নিউজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরও সেই ইন্সপেক্টরদের চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ডের কারণে কালো তালিকায় পড়তে পারে দেশের আকাশপথ।

জানা গেছে, পাইলট হতে একজন শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়া বাধ্যতামূলক। এরপর স্বীকৃত কোনো ফ্লাইং স্কুল থেকে গ্রাউন্ড কোর্সে উত্তীর্ণ হয়ে নির্ধারিত ফ্লাইং আওয়ার সম্পন্ন করে প্রথমে প্রাইভেট ও পরে কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স অর্জন করতে হয়। আর এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে অর্থ খরচ হয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু পাইলট হওয়ার মতো একটি কঠিন বিষয়কে পানির মতো সহজ করে ফেলেছিলেন সাদিয়া আহমেদ নামের এক নারী।

স্টার নিউজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিজ্ঞান নয়, মানবিক বিভাগ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে সাদিয়া আহমেদ বনে গেছেন পাইলট। শুধু তাই নয়, সিভিল অ্যাভিয়েশন থেকে লাইসেন্স নিয়ে দেশীয় তিনটি এয়ারলাইন্সে ১০ বছর উড়োজাহাজ উড়িয়েছেন সাদিয়া। সম্প্রতি এই জালিয়াতি ধরা পড়লে সাদিয়ার লাইসেন্স বাতিল করে সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ।

পাইলটদের লাইসেন্স দেয়ার অথরিটি কার? কীভাবে দেওয়া হয় এই লাইসেন্স? অনুসন্ধানে নামে স্টার নিউজ। জানা যায়, সিভিল অ্যাভিয়েশনের ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন্স বিভাগের অধীনে ৬ জন ফ্লাইট অপারেন্স ইন্সপেক্টরের সুপারিশেই ইস্যু হয় পাইলট লাইসেন্স। সেই ছয়জন ফ্লাইট অপারেন্স ইন্সপেক্টরের নথি সংগ্রহ করে স্টার নিউজ। সেই সব নথি দেখে রীতিমতো চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। এই ছয় ইন্সপেক্টরের পাঁচজনেরই লাইসেন্সের মেয়াদ নেই। অর্থাৎ, যারা অনুমোদন দেবেন, তাদের নিদেরই নেই লাইসেন্স।

স্টার নিউজের হাতে আসা নথিতে দেখা যায়, এই ছয়জনের মধ্যে ক্যাপ্টেন রাফি উল হকের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০০৬ সালে, ক্যাপ্টেন ফরিদ উজ জামানের ২০১৫ সালে, ক্যাপ্টেন আশরাফুল আজহারের ২০১৬ সালে, ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ মিয়ার ২০১৫ সালে এবং ক্যাপ্টেন মনিরুল হক জোয়ারদারের ২০২৫ সালে লাইসেন্সর মেয়াদ শেষ হয়েছে।

আরও অবাক করার বিষয় হচ্ছে, যে একজনের লাইসেন্স আছে সেই ক্যাপ্টেন ফেরদৌস হোসেনও লাইসেন্স পেয়েছেন ৬৮ বছর বয়সে। যদিও, বৈধ লাইসেন্সধারী পাইলটের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৬৫ বছর।

পাইলট লাইসেন্স প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত লাইসেন্সহীন ইন্সপেক্টরদের বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল অ্যাভিয়েশন লিখিত বক্তব্যে দাবি করে, এফওয়াই সংক্রান্ত সকল কাজ ইন্টারন্যাশনাল সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটির (আইকাও) নিয়ম অনুযায়ীই পরিচালিত হচ্ছে।

কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটির (আইকাও) নীতিমালা ৮৩৩৫-এর ৬.২.১.১ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, পাইলট লাইসেন্স সম্পর্কিত কার্যক্রম পরিচালনাকারী ইন্সপেক্টরদের বৈধ টাইপ রেটিংসহ বৈধ পাইলট লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি থাকতে হবে বেসামরিক বা সামরিক পাইলট হিসেবে কমপক্ষে ৫ হাজার ঘণ্টা বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা।

কিন্তু এসব নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই বাংলাদেশের সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি মেয়াদোত্তীর্ণ ছয়জন ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর দিয়ে পাইলট লাইসেন্স সুপারিশের কাজ করাচ্ছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পাইলটস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ক্যাপ্টেন সৈয়দ মাহবুব হেলাল স্টার নিউজকে বলেন, ‘হু আর দিস? তাদের তো ফিজিক্যাল ফিটনেস নাই। আর যেখানে আইকাও রুলসে বলা আছে যে, লাইসেন্স হোল্ডার ছাড়া এখানে অন্য কেউ এই জায়গায় আসতে পারবে না। হু ইজ গোইং টু ব্রেক ইট আউট।’

এদিকে, বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ চিঠি দেওয়ার পরও, সংস্থাটি মেয়াদউত্তীর্ণ ওই ইন্সপেক্টরদের চুক্তি নবায়ন করেছে। এমনকি আবারও তাদের নিতে আইকাও এর নিয়ম ভেঙ্গে মেয়াদউত্তীর্ণ ইন্সপেক্টরদের অনুকূলে সম্প্রতি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।

আইকাও নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন করে দেশের আকাশপথকে ঝুঁকির মুখে ফেলায় আসন্ন অডিটে গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার শঙ্কায় বাংলাদেশ।

এ বিষয়ে অ্যাভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) মফিজুর রহমান স্টার নিউজকে বলেন, ‘এখনো কিন্তু অনেক দেশ বাংলাদেশের লাইসেন্সকে মূল্যায়ন করতে চায় না। আমরা যে স্ট্যান্ডার্ডটা মেনটেন করতে চাই সেটা যদি সঠিকভাবে করতে পারি তাহলে আমি মনে করি আমাদের এ ধরনের ব্যত্তের মধ্যে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আইকাও অডিট যদি আমরা ফেস করি এগুলো নিশ্চয়ই প্রশ্নের মধ্যে মুখে পড়বে।’


সম্পর্কিত খবর :