Search

Search

এক্সক্লুসিভ ও ব্রেকিং খবর পেতে আপনার মোবাইল নম্বরটি দিন

স্টার পরিবারে আপনাকে স্বাগতম। নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা স্প্যাম করি না।

গলে যাচ্ছে সঞ্চিত বরফ, নীরব ভূমিকায় পৃথিবী

আনুমানিক ২০–২৫ বছরের মধ্যে প্রায় ৬,২০০ গিগাটন বরফ গলে সমুদ্রে মিশে গেছে | ছবি: সংগৃহীত
পৃথিবীর এক একজন মানুষ প্রতি ১৫ মিনিটে এক লিটার করে পানি সমুদ্রে ঢালছে। দিনরাত অবিরাম, টানা ২২ বছর ধরে। এই পুরো সময়ে সমুদ্রে যোগ হবে প্রায় ৬,২০০ গিগাটন পানি। এখনও পর্যন্ত এটি ছিল কেবল একটি কল্পিত দৃশ্য। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো— আজ এই ঘটনাই ঘটছে, তবে কোনো পানি ঢালার প্রয়োজন ছাড়াই। বায়ুমণ্ডল দূষণের ফলে পৃথিবী ও মহাকাশের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এই বিপুল পরিমাণ পানি নিজে থেকেই যোগ হচ্ছে সমুদ্রে।

গ্রিনল্যান্ডের বরফস্তর সঙ্কুচিত হওয়ার মধ্য দিয়েই এই প্রক্রিয়া চলছে। প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই প্রক্রিয়ায়, আনুমানিক ২০–২৫ বছরের মধ্যে প্রায় ৬,২০০ গিগাটন বরফ গলে সমুদ্রে মিশে গেছে।

গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার স্থলভাগের বিশাল বরফস্তর গলে সরাসরি সমুদ্রের পানিতে যোগ হচ্ছে। এই বিপুল ও ধারাবাহিক মিঠাপানির প্রবাহ বদলে দিচ্ছে সমুদ্রের লবণাক্ততার ভারসাম্য। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, পরিবর্তিত হচ্ছে সমুদ্রস্রোতের স্বাভাবিক গতি ও দিক। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, যার প্রভাব ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে অনুভূত হচ্ছে।

এই বরফ গলার প্রবণতা কেবল অনুমান নয়। নেচার জার্নালের ভলিউম ৬৩৯-এ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় জানানো হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে হিমবাহগুলো প্রতি বছর গড়ে ২৭৩ ± ১৬ গিগাটন বরফ হারিয়েছে, যার বড় অংশ সরাসরি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

পৃথিবী তার চিরচেনা স্বভাবের বাইরে গিয়ে ব্যতিক্রমী আচরণ করছে। গলে যাচ্ছে পৃথিবীর সঞ্চিত বরফ। খালি চোখে ভেসে থাকা বরফ দেখা গেলেও, এর পরিমাণ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। বরফ কমে যাওয়ার ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আরও বাড়ছে। আর্কটিক অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে যে পরিমাণ বরফ গলে যাচ্ছে, শীতকালে সেই অনুপাতে নতুন বরফ জমছে না। অন্যদিকে অ্যান্টার্কটিকায় বরফের আস্তরণ পাতলা হয়ে ভেঙে পড়ছে।

এসব তথ্য কেবল তাত্ত্বিক নয়। আর্কটিক মহাসাগরের সমুদ্রবরফ ৪৭ বছরের রেকর্ডে সবচেয়ে ছোট শীতকালীন আকারে পৌঁছেছে। বরফের সর্বোচ্চ বিস্তৃতি নেমে এসেছে মাত্র ৫.৫৩ মিলিয়ন বর্গমাইল, যা ২০১৭ সালের আগের সর্বনিম্ন রেকর্ডের চেয়েও কম। পার্থক্যটি প্রায় ৩০,০০০ বর্গমাইল, যা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের প্রায় সমান। অর্থাৎ কল্পনা করা যায়— যেন আর্কটিক অঞ্চল থেকে পুরো ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যটাই উধাও হয়ে গেছে।

গলে যাওয়া পানি পৃথিবীর বাইরে কোথাও গিয়ে পড়ে না। বর্তমানে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মানুষ নিচু উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ওপর। জাতিসংঘ এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও নেদারল্যান্ডস।

উপকূলীয় দেশগুলোতে বন্যা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। উপকূলীয় ঝড়, ঘূর্ণিঝড়জনিত জলোচ্ছ্বাস, উপকূল ভাঙন, লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, স্থায়ী জলাবদ্ধতা, আরও শক্তিশালী ঝড়ের প্রভাব এবং প্রতিবেশতন্ত্রের ক্ষতি—এসবই উপকূলীয় মানুষের জীবনকে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

বিশ্বব্যাংক জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশের ওপর একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২১০০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সর্বোচ্চ ০.৫ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

এর মধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব উপকূলে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যেসব প্রাকৃতিক কাঠামো এক সময় উপকূল রক্ষা করত— ম্যানগ্রোভ বন, জলাভূমি ও প্রবালপ্রাচীর— সেগুলো দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে লবণাক্ত পানি নদী, হ্রদ ও ভূগর্ভস্থ পানিতে ঢুকে পড়ছে, নষ্ট করছে মিঠাপানির উৎস ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

এই অবস্থার নীরব কিন্তু গভীর আঘাত পড়ছে মৎস্য ও কৃষি খাতে। বিপুল কৃষিজমি স্থায়ীভাবে তলিয়ে যাচ্ছে বা লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। কোথাও জমি উদ্ধার সম্ভব হলেও তা আবার উর্বর হতে সময় লাগে বহু বছর— এতে ব্যয় হয় অর্থ, সময় ও প্রযুক্তিগত সম্পদ। ফলে জাতীয় সম্পদের ক্ষয় ঘটে, উন্নয়ন ব্যাহত হয় এবং দেশের অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো— এর কিছুই অজানা নয়। বিশ্বনেতারা এসব দেখেও ব্যস্ত তর্ক, বাস্তবতা অস্বীকার এবং কার্যকর সমাধান বিলম্বিত করতে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা ও সংস্থাগুলো বহু আগেই সতর্ক করেছে বরফশূন্য আর্কটিক গ্রীষ্ম এবং শতাব্দীর শেষে ভয়াবহ সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্নো অ্যান্ড আইস ডাটা সেন্টারের বিজ্ঞানীরা মার্চ ২০২৫-এ প্রকাশিত তথ্যে জানিয়েছেন, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রাই এই বিপজ্জনক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। এর সঙ্গে সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোও আজ বিলুপ্তির মুখে।

সম্পর্কিত খবর :