এইচআরএসএস
নির্বাচনী সহিংসতায় হতাহতের ঘটনার নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে চলমান নির্বাচনী সহিংসতায় হতাহতের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। বিবৃতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী দল ও প্রার্থীদের প্রতি প্রতিহিংসার রাজনীতি, সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা বর্জন করে দলীয় ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের আহ্বান জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বিবৃতির মাধ্যমে নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন দলের মনোনয়ন কেন্দ্রীক সম্ভাব্য প্রার্থী এবং বঞ্চিত কর্মী-সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় ব্যানার-ফেস্টুন ধ্বংস, প্রার্থীদের উপর হামলা, মহাসড়ক অবরোধ ও টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ, বাড়িঘর–কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে।
বিগত চার মাসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও এইচআরএসএস এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে অন্তত ১১৩টি ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমপক্ষে ৯৮১ জন আহত ও ৫ জন নিহত হয়েছেন। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে শতাধিক আহত ও শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম নিহত হয়েছেন।
গত ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সালমান ওমরের সমর্থক মো. নজরুল ইসলাম নিহত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে বিএনপির প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন। গত ১৮ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি এক সপ্তাহের দীর্ঘ জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের পর সিংগাপুরের একটি হাসপাতালে মৃত্যু বরণ করেন।
গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন-বিজয়নগর এলাকায় সন্ত্রাসীরা দিন দুপুরে তার মাথায় গুলি করলে তিনি গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন। ওসমান হাদি একজন চিন্তাশীল রাজনৈতিক ব্যক্তি, গণঅভ্যুত্থানের একজন গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর এবং আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা করছিলেন।
গত ৫ নভেম্বর চট্টগ্রামে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে নির্বাচনী গণসংযোগে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে সরওয়ার হোসেন ওরফে বাবলা (৪৩) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এসময় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ, সরোয়ার ও শান্ত নামের তিনজন গুলিতে আহত হন। ঘটনাস্থলেই সরোয়ারের মৃত্যু হয়।
এছাড়া, ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনে বিএনপির মনোনয়ন দ্বন্দ্বের জেরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে তানজিন আহমেদ (৩০) নামে এক ছাত্রদল কর্মী মারা গেছেন। নিহত তানজিন আহমেদ ময়মনসিংহ নগরীর দৌলত মুন্সিরোড এলাকার মৃত আবুল হোসেনের ছেলে।
উদ্বেগের বিষয় যে, নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে কয়েকটি জেলায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে বিভিন্ন দলের বেশ কয়েকজন নারী কর্মী হামলা, মারধর, লাঞ্ছিত, প্রার্থীর প্রচার-প্রচারণায় বাঁধা, হেনস্থা, হিজাব খুলতে জোরাজুরি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, সাইবার বুলিং, ছিনতাই, ধাক্কাধাক্কিসহ নানা ধরণের নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। যা গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক, নাগরিক ও ভোটাধিকার, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের শামিল।
এইচআরএসএস মনে করে, নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন প্রার্থীদের আক্রমণাত্মক মনোভাব, বিরোধী দল ও অন্যান্য প্রার্থীদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো প্রার্থীদের হুমকি-ধামকি, অপপ্রচার, মিথ্যাচার এবং বিরূপ মন্তব্য দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে প্রতিহিংসা ও সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে। যা কোনভাবেই কাম্য নয়।
বিবৃতি আরও বলা হয়, বিগত আওয়ামী সরকারের অধীনে সারাদেশে বেশ কয়েকটি ‘অগ্রহণযোগ্য’ জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেসময়ে সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতির মধ্যেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ, প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণায় বাধা, প্রার্থীদের হুমকি-ধামকি, ভোট কারচুপি, জোরপূর্বক ভোটাধিকার হরণ, কেন্দ্র দখল, ভোট বাণিজ্যসহ নানা নির্বাচনী সহিংসতা ঘটেছিল। বর্তমান সময়ে এসেও সেসকল ঘটনা দেশের মানুষের সামনে পুনরায় ঘটছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে নানা সংস্কার ও পরিবর্তন আসলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে কোনো পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি, যা গভীরভাবে উদ্বেগের বিষয়।
এইচআরএসএস এসব নির্বাচনী সহিংসতায় দোষী ও জড়িতদেরকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছে। তাছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় অবস্থান ও তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকার ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আহ্বান জানিয়েছে।
পাশাপাশি একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সার্বিক সহযোগিতায় সকল অংশগ্রহণকারী দল ও প্রার্থীদের প্রতি প্রতিহিংসার রাজনীতি, সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা বর্জন করে দলীয় ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের আহ্বান জানাচ্ছে মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএস।