পারফিউমের সুগন্ধে পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে?
হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে অচেনা কারও গায়ে লেগে থাকা একটি পরিচিত পারফিউম, আর সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোন পুরনো বিকেল, কোন মানুষ, কিংবা এমন এক সময়, যা আর কখনো ফিরে আসবে না। তখন মনে প্রশ্ন জাগে— এই সুগন্ধ কীভাবে এত গভীর স্মৃতির দরজা খুলে দেয়?
মনোবিজ্ঞানের মতে, মানুষের ঘ্রাণ-সংক্রান্ত স্নায়ু সরাসরি মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম এর সঙ্গে যুক্ত। এই লিম্বিক সিস্টেমের মধ্যেই রয়েছে অ্যামিগডালা এবং হিপোক্যাম্পাস। অ্যামিগডালা ভয়, আনন্দ, দুঃখ নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে হিপোক্যাম্পাস স্মৃতি সংরক্ষণ করে।
এই কারণে কোনো ঘ্রাণ, বিশেষ করে পারফিউম অন্য ইন্দ্রিয়ের তুলনায় অনেক দ্রুত ও গভীরভাবে আবেগ ও স্মৃতি জাগিয়ে তোলে।
ঘ্রাণ, যা কথা বলে
ঘ্রাণের কোনো ভাষা নেই, তবু সে সবচেয়ে বেশি কথা বলে। মানুষের স্মৃতির ভাণ্ডারে ঘ্রাণের জায়গাটা আলাদা। কারণ আমরা যা দেখি বা শুনি, তা মস্তিষ্ক যুক্তি দিয়ে বিচার করে। কিন্তু যা শুঁকি, তা সরাসরি গিয়ে ছুঁয়ে ফেলে আবেগকে। পারফিউম তাই শুধু নাকের অনুভূতি নয়, এটি হৃদয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
স্মৃতির সঙ্গে সুগন্ধের বন্ধন
জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলো প্রায়ই কোনো না কোনো ঘ্রাণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। শীতের সকালে মায়ের শাড়িতে লেগে থাকা সাবানের গন্ধ, প্রথম ভালোবাসার ব্যবহৃত পারফিউম, কিংবা নতুন চাকরির প্রথম দিনে নিজের গায়ে দেওয়া সুগন্ধ— সব মিলিয়ে ঘ্রাণ হয়ে ওঠে সময়ের নীরব সাক্ষী। বহু বছর পর সেই একই গন্ধ আবার নাকে এলে স্মৃতিও ফিরে আসে অবিকল আগের মতো, অক্ষত আবেগ নিয়ে।
পারফিউম, এক ধরনের অনুভূতির মানচিত্র
অনেকে খেয়াল করে দেখেছেন, জীবনের একেকটি অধ্যায়ে পছন্দের পারফিউম বদলে যায়। আনন্দের সময়ে হালকা ফুলের ঘ্রাণ, আত্মবিশ্বাসের সময় একটু গাঢ় উডি নোট, আর বিষণ্ণ সময়ে নরম, শান্ত সুগন্ধ। অজান্তেই আমরা নিজের আবেগ অনুযায়ী ঘ্রাণ বেছে নিই। তাই পুরনো কোনো পারফিউম মানেই পুরনো আমি, পুরনো অনুভূতি, পুরনো জীবন।
সুখের স্মৃতি, বেদনার স্মৃতিও
সব সুগন্ধ সুখের নয়। কিছু পারফিউম আছে, যা মনে করিয়ে দেয় বিচ্ছেদ, হারানো মানুষ বা অসমাপ্ত গল্প। তাই অনেকেই হঠাৎ কোনো সুগন্ধে অস্বস্তি অনুভব করেন। আবার কেউ কেউ ইচ্ছে করেই সেই পারফিউম ব্যবহার করেন না, কারণ স্মৃতির ভার বহন করা সব সময় সহজ নয়।
সুগন্ধে সান্ত্বনার খোঁজ
এ কারণেই আজকাল ঘ্রাণকে ব্যবহার করা হচ্ছে মানসিক যত্নের অংশ হিসেবে। ঘরে হালকা সুগন্ধ, প্রিয় পারফিউম কিংবা পরিচিত কোনো গন্ধ অনেক সময় একাকীত্ব কমিয়ে দেয়। মন খারাপের দিনে পরিচিত সুগন্ধ যেন নীরবে বলে, ‘সব সময় এমন থাকবে না।’
পারফিউম সত্যিই পুরনো স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। কারণ স্মৃতি শুধু মনে থাকে না, সে বাসা বাঁধে ঘ্রাণে। এক ফোঁটা সুগন্ধেই ফিরে আসে সময়, মানুষ আর অনুভূতির গল্প—নিঃশব্দে, গভীরভাবে।’