ভারতের কৌশলী চালে রক্ত ঝরছে পাকিস্তানে?
আর্থিক ও রাজনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তান আবারও রক্তাক্ত। দেশটির দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলীয় ইরান-আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী বালুচিস্তানে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় ঝরল প্রায় ২০০ প্রাণ। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ মরুময় এই প্রদেশ ঘিরে গেম খেলছে ভারত, বার বার এমন দাবিই করে এসেছে পাকিস্তান।
সবশেষ বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি-বিএলএ’র হামলার পর পাকিস্তান আবারও সেই অভিযোগ তুলেছে। ইসলামাবাদের দাবি, বিদ্রোহীদের সমর্থন জুগিয়েছে ভারত। যদিও ভারত সরাসরি এমন অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের ধারণা, ভারত হয়ত, এক ঢিলে দুই পাখি মেরে, কাবু করতে চাইছে পাকিস্তান ও চীনকে।
ব্রিটিশ শাসন থেকে পাকিস্তান আলাদা হওয়ার পর থেকেই স্বাধিকারে দাবিতে অস্ত্র তুলে নেয় বালুচরা। ১৯৪৮ সালে বড় ধরনের সংঘাতে প্রদেশটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে পাকিস্তান। তবে দশকের পর দশক ধরেই অস্থিতিশীল রয়েছে এই প্রদেশটি। আর এই প্রদেশকে অস্থিতিশীল করে রাখার পেছনে ভারতই দায়ী বলে মনে করে পাকিস্তান।
পাকিস্তানের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ বালুচিস্তান?
আয়তনের দিক থেকে পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বালুচিস্তান। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রদেশটি অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। এটি ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্তলাগোয়া এবং আরব সাগরের প্রবেশদ্বার।
রিস্ক ইন্টেলিজেন্সের মতে, এই ভৌগোলিক অবস্থান বালুচিস্তানকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলেছে। সেই সম্ভাবনাকে আরও কাজে লাগাতে চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপিইসি) আওতায় গোয়দরকে গভীর সমুদ্রবন্দর বানানো হয়েছে। এই সমুদ্রবন্দর চীন, মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সংযোগকারী একটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি রুটে পাকিস্তানের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করেছে।
এই প্রদেশটি প্রাকৃতিক সম্পদেও সমৃদ্ধ। ইবিএসসিও রিসার্চ স্টার্টার্সের তথ্যানুসারে, বালুচিস্তানে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, তামা, সোনা এবং বিরল মৃত্তিকা খনিজের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। এর মধ্যে সুই গ্যাসক্ষেত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা পাকিস্তানের জ্বালানির বড় চাহিদা মেটায়।
পাকিস্তানে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ
চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয়েরই বালুচিস্তানে গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয় যে তারা বালুচিস্তানের দুর্গম চাগাই জেলায় রেকো ডিক খনিতে স্বর্ণ ও তামাসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলনে সহায়তার জন্য ১২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে।
এর কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইউএসএসএম পাকিস্তানের ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশনের সঙ্গে ৫০ কোটি ডলারের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির উদ্দেশ্য বিরল মৃত্তিকা খনিজ ও অন্যান্য খনিজের উত্তোলন ও পরিশোধন সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা—বিশেষত বালুচিস্তানে, যেখানে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় বিরল মৃত্তিকা খনিজের মজুত রয়েছে।
চীনের জন্য এই স্বার্থের গুরুত্ব আরও বেশি। বালুচিস্তান হলো চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ, যা বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি প্রধান প্রকল্প।
নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিপিইসি’র লক্ষ্য হলো মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের জ্বালানি আমদানির পথ নিরাপদ ও সংক্ষিপ্ত করা। এই প্রকল্পের মূল ভিত্তি হলো গোয়াদরের গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন এবং বালুচিস্তানের মধ্য দিয়ে আরব সাগরকে শিনজিয়াংয়ের সঙ্গে সংযুক্তকারী সড়ক ও রেল নেটওয়ার্ক।
যেভাবে খেলছে ভারত
ইউআইটি দ্য আর্কটিক ইউনিভার্সিটি অব নরওয়ের সেন্টার ফর দ্য পিস স্টাডিজের গবেষক আরসালান বিলাল বলেন, পাকিস্তানের কৌশলই ইসলাবামাদের ওপর প্রয়োগ করছে ভারত। সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে পাকিস্তান যেমন ভারতের ভেতর সন্ত্রাসীদের ইন্ধন জুগিয়েছে, ভারতও ঠিক সেই পথ বেছে নিয়েছে।
ভারত এটিকে প্রতিরক্ষামূলক আক্রমণাত্মক কৌশল হিসেবে বর্ণনা করছে। ভারতে বড় বড় সন্ত্রাসী হামলা বিশেষ করে ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার পর নিজেদের কৌশলে পরিবর্তন আনে নয়াদিল্লি। পাকিস্তানকে শিক্ষা দিতে পরবর্তী কয়েক বছর ভারত এই কৌশল দাঁড় করায়। এরপর ২০১৪ সালে ভারতে ক্ষমতায় আসে নরেন্দ্র মোদির সরকার।
এরপরই বাস্তবায়ন শুরু হয় এই প্রতিরক্ষামূলক আক্রমণাত্মক কৌশলের। পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তানকে সামনে থেকে আঘাত না করে, পিঠে ছুরি বসানোর সেই কৌশলে সাফল্যও পেয়েছে নয়াদিল্লি। এই কৌশল নিয়ে প্রায় এক দশক আগেই খোলামেলা কথা বলেছিলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল।
তিনি বলেছিলেন, প্রতিরক্ষামূলক অবস্থায় আপনি যদি আমার দিকে ১০০টা পাথর ছোড়েন, আমি ৯০টা ঠেকাতে পারি—তবু ১০টা আমাকে আঘাত করবে। আর এভাবে আমি কখনই জিততে পারব না।
‘কিন্তু একবার যখন তারা বুঝতে পারবে যে ভারত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে প্রতিরক্ষামূলক আক্রমণাত্মক কৌশলে গিয়ার বদলেছে, তখন তারা দেখবে—এর ক্ষতি তাদের পক্ষে বহনযোগ্য নয়। আপনি একটি মুম্বাই ঘটাতে পারেন, কিন্তু তার বিনিময়ে বালুচিস্তান হারাতে হতে পারে।’
২০১৬ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও অনেকটা এই ভাষায় পাকিস্তানকে কড়া বার্তা দেন। জানান, তার দেশ হুমকির মুখে পড়লে, ভারতও বালুচিস্তান প্রদেশকে অস্থিতিশীল করতে প্রস্তুতি নিতে পারে।