Search

Search

এক্সক্লুসিভ ও ব্রেকিং খবর পেতে আপনার মোবাইল নম্বরটি দিন

স্টার পরিবারে আপনাকে স্বাগতম। নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা স্প্যাম করি না।

গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া

সংগৃহীত
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া এক অবিস্মরণীয় নাম, এক সময় যিনি ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ। সময়ের পরিক্রমায় তিনিই হয়ে ওঠেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং তিনবারের সরকারপ্রধান। ঘরকেন্দ্রিক ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর এই যাত্রা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দাম্পত্য জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি ছিলেন ঘরকেন্দ্রিক, দুই পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর লালন-পালন এবং পরিবার সামলানোই ছিল তার প্রধান ভূমিকা। রাজনীতির সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা তখন দৃশ্যমান ছিল না।

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আসেন এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে খালেদা জিয়ার জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। স্বামীর মৃত্যুর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্ব সংকটে পড়লে দলটির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে তার যাত্রা শুরু হয় ঠিক সেখান থেকেই।

আশির দশকে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন বিরোধী রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ। আন্দোলন, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মধ্য দিয়েই তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন শক্ত ও সংগঠক নেত্রী হিসেবে। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠে স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলন।

১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই সময় সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা তার সরকারের অন্যতম বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে স্বল্প সময়ের জন্য এবং ২০০১ সালে আবারও তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তার শাসনামলে শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক খাতে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। ফোর্বস ম্যাগাজিন নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে তার ভূমিকার জন্য ২০০৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তাকে ২৯ নম্বরে স্থান দেয়।

২০১১ সালের ২৪ মে নিউ জার্সি স্টেট সিনেটে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে ‘ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ পদক দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট সিনেট কর্তৃক কোনো বিদেশিকে এ ধরনের সম্মান দেওয়ার ঘটনা এটাই ছিল প্রথম। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই তাকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ সম্মাননা দেয় কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (সিএইচআরআইও) নামের একটি সংগঠন।

তিনি ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনগুলোতে পাঁচটি পৃথক সংসদীয় আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে তিনি যে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন সেখানে তিনি সব ক'টিতে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলেন।

২০০৯ সাল থেকে যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার নির্বিচারে গুম, খুন, ক্রসফায়ার আর বিনাবিচারে ভিন্নমতের রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র থেকে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত করে, তখন তিনি গণতন্ত্রের জন্য তার লড়াই নতুন করে শুরু করেছিলেন। সরকার তাকে জোরপূর্বক তার বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বের করে দেয় এবং গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন শুরু করায় তাকে দুইবার গৃহবন্দী করা হয়।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়াকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

তার রাজনৈতিক জীবন সংঘাতময় থাকলেও ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনীতির দ্বন্দ্ব, আন্দোলন ও পাল্টা আন্দোলনে বারবার উত্তাল হয়েছে রাজপথ। তবুও সমর্থকদের কাছে তিনি আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠা বেগম খালেদা জিয়ার জীবন কেবল একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের নারী নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। সময়ের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও তার উত্থান দেশের রাজনীতিতে একটি স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন।

সম্পর্কিত খবর :