রাষ্ট্রীয় বাহিনীর খুনের ব্লু-প্রিন্ট!
ঢাকার হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ হামলা স্তব্ধ করে দেয় পুরো বিশ্বকে। এই হামলায় প্রাণ হারান দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ২২ জন। এই সংকটের পর ‘জঙ্গি দমনের’ নামে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। দেশের বিভিন্ন এলাকায় চালানো হয় বিশেষ অভিযান। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় একটির পর একটি জঙ্গি আস্তানা ধ্বংসের কথা। হিসাব দিয়ে জানানো হয়, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে এসব অভিযানে অন্তত ৪৫ জন নিহত হন।
কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে রয়ে গেছে অনেক অজানা প্রশ্ন, অনেক অভিযোগ এবং কিছু পরিবারের আজীবনের ক্ষত। এই অনুসন্ধানে আমরা এমনই তিনটি ‘কথিত’ জঙ্গিবিরোধী অভিযানের গল্প বলবো। খুঁজে দেখবো, সেগুলো কতটা বাস্তব ছিল, আর কতটা সাজানো।
৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬। তখন রাত পৌনে ৯টা। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশের একটি দল মিরপুরের রূপনগরের একটি বাড়ি ঘিরে ফেলে। এর কিছুক্ষণ পরই ঘটনাস্থলে যায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট- সংক্ষেপে যেটি ‘সিটিটিসি’ নামে পরিচিত। চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় আশপাশের সবাইকে দরজা-জানালা লাগিয়ে নিজ নিজ ঘরে অবস্থান নিতে বলে পুলিশ। এরপর শুরু হয় অভিযান।
গভীর রাতে পুলিশ ঘোষণা করে, অভিযান চলাকালে বন্দুকযুদ্ধে মারা যান ভয়ঙ্কর এক জঙ্গি নেতা ও আহত হয় রূপনগর থানার দুই পুলিশ পরিদর্শকসহ তিনজন। নিহত সন্দেহভাজন জঙ্গির পরিচয় মেলে পরের দিনই। তিনি ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। সিটিটিসি জানায়, সেনাবাহিনীর এই সাবেক কর্মকর্তা ছিলেন জেএমবি’র সামরিক শাখার একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
এ ব্যাপারে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এটি এম জিয়াউল হাসান বলেন, ‘মেজর জাহিদের হত্যাকাণ্ড হওয়ার পরে, যে দিন আমি প্রথম পেপারের ছবিটা দেখলাম আমাকে সাংঘাতিক কষ্ট দিয়েছিল। সেই কষ্টের বোঝা আমি বহুদিন বয়ে বেড়িয়েছি, ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। কারণ আমি মেজর জাহিদকে আমি খুব কাছে থেকে চিনি।’
তিনি স্টার নিউজকে আরও বলেন, ‘এটা খুবই অবাক করার ব্যাপার। তাকে হত্যার পর আমি জানলাম সে নাকি জঙ্গির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অথচ ওই সময়ে একটা অফিসার যদি এরকমই হতো, তাহলে কিন্তু তার কথাবার্তায় চালচলনে বা পোশাকে দেখে বুঝার কথা।’
তিনি বলেন, ‘মেজর জাহিদ ছিলেন খুবই মিলিট্রি অফিসারের ধরনের মানুষ। তার স্ত্রীও একজন সাধারণ বাঙালি গৃহবধূর মতো। যেভাবে জীবনযাপন করে তাই অতিরিক্ত পর্দা বা এই ধরনের এই ধরনের মানে এক্সট্রিমিজম তার ভিতরে কখনোই দেখা যায়নি।’
সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার আগে ২০১১ সালে মেজর জাহিদ, ব্রিগেডিয়ার জিয়া অধীনে সিলেটে ‘স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিক্স’-এর রণকৌশল শাখায় একজন প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন। এরপর স্টার নিউজ রূপনগরের সেই ঘটনার এজহার ও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ করে। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে সেটির পুরো বর্ণনা আছে এই এজহারে।
বলা হয়, পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মেজর জাহিদ দরজা খুলে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এসে চারজন পুলিশ অফিসারকে চাকু দিয়ে জখম করে এবং তাদের একজনকে আবার গুলিও করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মেজর জাহিদকে মোট ২৯ রাউন্ড গুলি করে ছয়জন পুলিশ। আর তখনই মেজর জাহিদ লুটিয়ে পড়ে মারা যান। এজাহারটি সাব ইন্সপেক্টর মেহেদী হাসানের সই করা, যিনি ওই ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন। তাকেও খুঁজে বের করে স্টার নিউজ।
সেই সাব ইন্সপেক্টর মেহেদী হাসান এখন বদলি হয়ে আছেন নওগাঁর রানী নগর থানায়। তিনিই মামলার বাদী এবং মেহেদী জাহিদকেও গুলি করেছিল বলে নিজেই এজহারে উল্লেখ্য করেন। ক্যামেরার সামনে তিনি কোনভাবেই কথা বলতে রাজি হচ্ছিলেন না। ঘটনাটি বিস্তারিত জানাতে চাচ্ছিলেন না। কথাবার্তাও ছিল অসংলগ্ন। তাকে স্টার নিউজের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথমে যাইয়া জাহিদের বাসার সিটকানি লাগাই দেই। পরে সে দরজা ভেঙে বের হয়ে দৌড় দেয়। ও যখন ওপর থেকে নামছে পুলিশ ওরে বাধা দিছে। মূলত ও বাসায় সে একাই ছিল। কিন্তু কাউন্টার টেরোরিজম মামলায় লেখে যে সেখানে আরও লোক ছিল। কিন্তু আসলে সত্যি কথা সে একাই ছিল।’
গুলি কোন প্রেক্ষাপটে করা হয়েছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে সরাসরি কোনো উত্তর দেননি মেহেদী। তবে এটা বোঝা যায় মামলাটি মেহেদী লেখেননি। এ ব্যাপারে মেজর জাহিদের তৎকালীন বাড়িওয়ালা হাসিবুর রহমান স্টার নিউজকে বলেন, ‘মেজর জাহিদ বাড়িতে এলে আমি ওসিকে জানাই, সে বাসায় এসেছে। এর ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে পুলিশ ও সোর্সের লোকজন এসে পুরো বিল্ডিং ঘেরাও করে ফেলে এবং এলাকার গলি সিল করে দেয়।’
জানা যায়, ওই অভিযানের পর বাড়িটি জঙ্গিবাড়ি হিসেবে এলাকায় পরিচিতি পায়। ফলে বেশিরভাগ ভাড়াটিয়া বাসা বদল করে ফেলেন। তবে নিচতলায় এখনো আগের ভাড়াটিয়া আছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক হাতাহাতি হয়। বুঝা গেছে যে অনেক কষ্ট করে তাকে নিয়ে আসছেন উনারা।’
রূপনগর থানার পুলিশ কর্মকর্তা যিনি প্রথম সিঁড়িতে মেজর জাহিদকে বাধা দেন এবং চাকুর আঘাতে আহত হয়েছিলেন। এই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে স্টার নিউজ। তিনি কোনোভাবেই ক্যামেরার সামনে আসতে চাননি। তবে সেই অভিযান নিয়ে কথা বলেছেন মোবাইলে।
স্টার নিউজ জানতে পেরেছে যে, জাহিদের হাতে পিস্তল ছিল না। এটা কি ঠিক? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক।’ এজহার মেহেদীর লেখা ছিল না, মানে আপনাদের থানার লেখা ছিল না, কাউন্টার টেরোরিজম লিখেছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জি এটা ঠিক।’
তদন্ত প্রতিবেদনে যেটা আসছে যে জাহিদ গুলি করেছে। এটা কি সাজানো কল্প কাহিনী? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আপনাকে তো পরিষ্কার করে বললাম। তার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না, গুলি করবে কীভাবে?’
রূপনগরের সেই বাড়িটিতে মেজর জাহিদ দুই সন্তান ও স্ত্রীসহ থাকতেন। একটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে, অভিযানের দিন তারা কোথায় ছিলেন। সেটির উত্তর মামলার এজহারে নেই; তবে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, অভিযানের আগেই লালবাগের একটি বাড়িতে মেজর জাহিদ তার পরিবারকে রেখে এসেছিল। কিন্তু মেজর জাহিদের পরিবার বলছে ভিন্নকথা। তার স্ত্রী জেবুননাহার শীলা জানাচ্ছেন, অভিযানের দিন কয়েকঘন্টা আগে সাদা পোশাকে ডিবি পুলিশ এসে তাকে, দুই মেয়েসহ রূপনগর বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়।
এ ব্যাপারে মেজর জাহিদের স্ত্রী জেবুননাহার শিলা বলেন, ‘প্রথমে আমাকে ও বাচ্চাদের নিয়ে নিচে নামানো হয় এবং বলা হয় জাহিদকে পরে নিয়ে আসা হবে। পরে জানতে পারি যে বাসার নিচেই তাকে (স্বামীকে) গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’
তিন মাস ডিবি কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়েছিল শিলাকে। সঙ্গে ছিল ছোট মেয়ে…, তখন তার বয়স ছিল মাত্র এক বছর। আর ১২ বছর বয়সী বড় মেয়ে জুনাইরা নুরিনকে আলাদা রাখা হয় বলে জানান মেজর জাহিদের স্ত্রী।
এবার আরেকটি জঙ্গি অভিযানের ঘটনা জানা যাক। ঘটনাস্থল রাজধানীর আজিমপুর। রূপনগর জঙ্গি অভিযানের ৯ দিন পরের এই অভিযানে তিনজন নারী জঙ্গিকে আটক করা হয় বলে পুলিশ জানায়। সেই অভিযানে আবিষ্কার হয় মেজর জাহিদের বড় মেয়ে নুরিন। তিনি বলেন, ‘সে সময় আমি মায়ের সঙ্গেই ছিলাম, কিন্তু পরে একটি গাড়িতে করে আজিমপুরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তার ছবি তোলা হয়। পরবর্তীতে একজন আন্টি ও আঙ্কেল আমাকে অন্য একটি মাইক্রোবাসে করে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে যান এবং তিন দিন পর তার নানা-নানি এসে আমাকে নিয়ে যান।’
এরপরের অভিযান আরও বড়। ২০১৬ সালের শেষ দিকে, ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর দক্ষিণখানের আশকোনা এলাকার সূর্য ভিলা নামক একটি বাড়িতে ‘অপারেশন রিপোল টোয়েন্টিফোর’ চালায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। পুলিশ তখন জানিয়েছিল, অভিযানে দুই জঙ্গি নিহত হয় এবং দুই নারী আত্মসমর্পণ করে। তাদেরই একজন ছিলেন মেজর জাহিদের স্ত্রী।
এরপর ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় শিলাকে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়। চার বছর পর জামিনে মুক্ত হন জেবুননাহার শিলা।
কারাগারে থাকার সময়ের কথা বলতে গিয়ে মেজর জাহিদের স্ত্রী বলেন, ‘কারাগারে থাকাকালীন আমার স্বামী নিহত হওয়ার এক বছরের মধ্যেই আমার শ্বশুর ও শাশুড়ি দুজনেই স্ট্রোক করে মারা যান। এছাড়া ২০২০ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র এক দিন আগে নিজের বাবাও মারা যান। জেলখানায় থাকা অবস্থায় আমাকে পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ বা ফোন কল করতে দেওয়া হতো না।’
একটি প্রশ্ন, তিনি যদি জঙ্গি না হয়ে থাকেন তাহলে মেজর জাহিদ ও তার পরিবারের ওপর এমন আক্রোশের কারণ কী? সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজে স্টার নিউজ। এই সমীকরণ মেলাতে যেতে হবে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায়। বিডিআর বিদ্রোহের সময় আটকে পড়া অনেক সেনা কর্মকর্তাই তখন ফোন করে তাদের বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছিল। তাদেরই একজন ছিলেন ক্যাপ্টেন মাজহার। সে সময় তিনি কল করেছিলেন মেজর জাহিদকে।
এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল বলেন, ‘২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সময় আমি সেনাবাহিনীর ডাইরেক্টর অপারেশন ছিলাম। এডিসি ক্যাপ্টেন মাজহার এবং মেজর জাহিদ কোর্সমেট ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের সময় ক্যাপ্টেন মাজহার জাহিদকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে, ভিতরে যারা অফিসারদের মারছে তারা বিডিআর সদস্য নয়, কারণ তারা ভিন্ন ভাষায় কথা বলছিল। এই সংবেদনশীল তথ্যটি জাহিদের কাছে ছিল এবং তিনি এটি নিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। জাহিদ গুরুত্বপূর্ণ ও অথেনটিক এই তথ্য জানতেন, যা তৎকালীন সরকারের জন্য হুমকি হতে পারত, এবং এটাই তাকে হত্যার মূল কারণ হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘সে যখন এই পুরো সিস্টেমের ওপর বীতশ্রদ্ধ, নিজের থেকে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে এবং চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরে তো সে তখন সবার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত। এবং যখন তারা জেনে যায় যে জাহিদ এরকম একটা সেনসিটিভ ইনফরমেশন সে জানে, তখন তাকে কীভাবে মানে হত্যাযোগ্য করা যায় সেটার একটা পরিকল্পনা চলতে থাকে। সেটারই অংশ হিসেবে জাহিদকে তখন জঙ্গি হিসেবে ট্যাগ দেওয়া হয়। এটা জানার পরে জাহিদের ব্যাচমেটরা সম্ভবত সেনাবাহিনীতে বিভিন্নভাবে জানিয়েছে যে এটা কিন্তু অন্যায় হচ্ছে। তখন সেনাবাহিনীর ভিতরে আমি এটাও পরে জেনেছি যে, তারা বিভিন্ন সেনানিবাসে জানতে চেয়েছে যে জাহিদ কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত আছে কি-না বা জাহিদের কোনো পীর আছে কি-না বা এই ধরনের একটা ফিলসফিতে সে বিশ্বাস করে কি-না। প্রত্যেক জায়গা থেকে জানানো হয়েছে যে, জাহিদের এ ধরনের কোনো যোগাযোগ কারো সঙ্গে নাই।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই মর্গে পড়ে ছিল মেজর জাহিদের লাশ। এরপর হস্তান্তর করা হয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে। তারা অজ্ঞাতনামা হিসেবে দাফন করে জুরাইন কবরস্থানে। সেই কবরস্থানেই বাবার লাশ খুঁজে এসেছিলেন তার দুই মেয়ে। তারা জানেন না, ঠিক কোন মাটির নিচে তাদের বাবা মিশে আছে।
এ ব্যাপারে মেজর জাহিদের মেয়ে জুনাইরা বিনতে জাহিদ বলেন, ‘ছোটবেলার সেই ধাক্কা বা ট্রমা সবসময়ই থেকে যাবে এবং সেই স্মৃতি কখনো মুছে ফেলা সম্ভব নয়। …আমার বাবা কখনোই কোনো জঙ্গি হতে পারেন না। তিনি ইসলামকে ভালোবাসতেন বলেই তাকে জঙ্গি বলা ঠিক নয়। তার হত্যার বিচার চাই।’