Search

Search

এক্সক্লুসিভ ও ব্রেকিং খবর পেতে আপনার মোবাইল নম্বরটি দিন

স্টার পরিবারে আপনাকে স্বাগতম। নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা স্প্যাম করি না।

নরিয়েগা থেকে মাদুরো; এরপর কে?

পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগা এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো | ছবি: কোলাজ
পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটকের উদ্দেশ্যে ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর দেশটিতে সামরিক অভিযানে নামে যুক্তরাষ্ট্র। অভিযানের নাম ‘অপারেশন জাস্ট কজ’। আত্মগোপনে থাকা নরিয়েগা ৩ জানুয়ারি ১৯৯০ সালে মার্কিন বাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। নরিয়েগার শাসনে নিষ্পেষিত পানামার জনগণ তখন দেশের মাটিতে মার্কিন সেনাদের স্বাগত জানাতে দ্বিধা করেনি। পানামার সেই জনগণই আজ ২০ ডিসেম্বর দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে। আর পূর্ব প্রজন্মের সেই উল্লাসের প্রায়শ্চিত্ত করে।

মাদুরো নিজের নির্বাচনী পরাজয়কে উপেক্ষা করে ভেনেজুয়েলার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। নিঃসন্দেহে তার এই প্রস্থান বহু নাগরিকের কাছে স্বস্তিদায়ক। মাদুরো’র পতনে তাই ভেনিজুয়েলার মানুষও উল্লসিত। সাদ্দাম পতনের পর যেভাবে উল্লাস করেছে বাগদাদের মানুষ। বন্দুকের বারুদ ফুটিয়ে উল্লাসে মেতেছিল গাদ্দাফি মুক্ত লিবিয়ার মানুষ। সেই বন্দুকগুলো আজ প্রতিদিন লিবিয়ার মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে। দেশটির সরকার থাকে বিদেশে। আর দেশের মাটিতে নিজেদের রক্ত ঝরায় শত শত সশস্ত্র গ্যাং।

মাত্র এক দশকেই এই মানুষগুলোর উপলব্ধি বদলে গেছে। সেই একই মানুষ ‘ভাইস নিউজ’-এর প্রামাণ্য চিত্রে প্রশ্নের জবাবে বলেছেন ‘ভুল করেছি’। ইরাকে রক্তাক্ত বিপর্যয় নেমে এসেছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরে যেতেই আফগানিস্তানে বিপুল অর্থ ব্যয়ে গড়া তাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়েছে। সেই আফগানিস্তানের নারীরা আজ শিক্ষা বঞ্চিত।

১৯৯৪ সালে হাইতিতে ২৫ হাজার সেনা ও দুটি বিমানবাহী রণতরী দেশটির শাসন পাল্টে ফেলেন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। কিন্তু পরের ত্রিশটি বছর দুর্দশাগ্রস্ত দেশের নাম ছিল হাইতি। সেই হাইতিও আজ সশস্ত্র গ্যাংয়ের দখলে থাকা এক ব্যর্থ রাষ্ট্র। সত্তরের দশকে নিকারাগুয়ার বিপ্লবী সান্দানিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে কীভাবে কৃত্রিম বিদ্রোহ তৈরি করে দেশটিকে দীর্ঘ মেয়াদী গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয় যুক্তরাষ্ট্র সে ইতিহাস অনেকের জানা।

মাত্র কয়েক ঘণ্টার অভিযানে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টকে তার বাসভবন থেকে সস্ত্রীক তুলে নেওয়ার ঘটনায় যারা বিস্মিত, তারা হাইতি নিকারাগুয়া কিউবাকে ভুলে গেছেন। বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রোকে হত্যায় সিআইএ’র ৬৩৮টি ব্যর্থ ষড়যন্ত্রের কথা ভুলে গেছেন। লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সশস্ত্র হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস ভুলে গেছেন।

তবে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। এই লোকটির মধ্যে কোনো ভনিতা নেই। ইরাক-আফগান যুদ্ধের বেলায় বুশ সিনেটে বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছেন। সিআইএ’র মাধ্যমে ‘উইপন অব ম্যাস ডেস্ট্রাকশান’-এর ভুয়া গল্পের নথি সাজিয়েছেন। গণতন্ত্র আমদানির স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্প সেসবের ধার ধারেননি। ভেনেজুয়েলার বেলায় একবারও তিনি ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি। বরং বলেছেন ‘নিরাপদ, সঠিক ও বিচক্ষণ ক্ষমতা হস্তান্তর’। ভেনেজুয়েলার বিপুল খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণের কথাটাও বলেছেন একদম খোলামেলা; ‘আমরা মাটি থেকে বিপুল সম্পদ তুলব, সেই সম্পদ ভেনেজুয়েলার জনগণের কাছে যাবে, যারা ভেনেজুয়েলার বাইরে ছিল তাদের কাছেও যাবে, এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও যাবে।’

কিন্তু ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের প্রতিধ্বনি ভেনেজুয়েলা ছাড়িয়ে আরও বহুদূর ছড়িয়ে পড়বে। বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রোর আমলে দেশটিতে একের পর এক ব্যর্থ হয়েছে সিআইএ। সেই ফিদেল আর নেই। তাই কিউবাও নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ডা। কিউবা প্রশ্নে সবচে বেশি আগ্রহী পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও। যার বাবা-মা কিউবান-আমেরিকান।

ট্রাম্পের এজেন্ডায় আছে গ্রিনল্যান্ড। ডেনমার্কের এই ভূখণ্ডটি আর্কটিক অঞ্চলের একটি কৌশলগত অবস্থান। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গলছে আর্কটিকের বরফ। বেরিয়ে আসছে অঞ্চলটির প্রাকৃতিক সম্পদ। সে দিকে হাত বাড়ানোর ইচ্ছাটা খোলাখুলিই জানিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। যেভাবে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়ার বিনিময়ে দেশটির খনিজ সম্পদের ভাগ চেয়েছিলেন তিনি।

প্রশ্ন হলো যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ চীনকে একটি নজির দেখালো। তাইওয়ানকে তারা একটি বিচ্ছিন্ন প্রদেশ হিসেবে দেখে এবং বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনাকে তাদের জাতীয় অগ্রাধিকার বলে মনে করে।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার যিনি সিনেটের ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান; তার আশঙ্কাটি সামনে আনা যাক-‘যদি যুক্তরাষ্ট্র অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বিদেশি নেতাদের ধরে আনতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অধিকার দাবি করে, তবে তাইওয়ানের নেতৃত্বের ওপর একই দাবি তুললে চীনকে কে আটকাবে? ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে অপহরণের যুক্তি দেখালে পুতিনকে কে থামাবে? এই সীমা একবার অতিক্রম হলে, বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর নিয়মগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করবে। কর্তৃত্ববাদী শাসনগুলোই প্রথম এর সুযোগ নেবে।’

সম্পর্কিত খবর :