Search

Search

এক্সক্লুসিভ ও ব্রেকিং খবর পেতে আপনার মোবাইল নম্বরটি দিন

স্টার পরিবারে আপনাকে স্বাগতম। নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা স্প্যাম করি না।

নিজাম উদ্দিন চৌধুরী সুজন: বিসিবিতে অনিয়মের মুকুটবিহীন সম্রাট

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিজাম উদ্দিন চৌধুরী সুজন | ফাইল ছবি
গত ১১ বছরে বিভিন্ন অভিযোগে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) থেকে চাকরি গেছে অসংখ্য মানুষের। তবে পর্বতসম অভিযোগ থাকলেও বহাল তবিয়তে আছেন বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিজাম উদ্দিন চৌধুরী সুজন।

২০০৮ সালে তিনি প্রথমবার বিসিবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে তাকে পূর্ণাঙ্গ প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকে তার নামে ওঠে একের পর এক অভিযোগ।

২০১৫ সালের অক্টোবরে বিসিবির ফাইনান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস বিভাগের এক্সিকিউটিভ পদে চাকরি পান জুয়েল সরকার। পাপনের বোর্ডে মল্লিক-শেখ সোহেলের সঙ্গে খাতির জমিয়ে বোর্ড প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রভাব খাটাতে শুরু করেন জুয়েল। দুর্নীতির গুরুত্বপূর্ণ নথি আর টাকা চুরির অভিযোগ থাকার পরেও কোনো এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে সেই প্রভাব এখনো ধরে রেখেছেন জুয়েল।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গভীর রাতে দলবল নিয়ে বিসিবিতে হানা দেন এই জুয়েল সরকার। ঘণ্টা খানেক পর কয়েকটা ব্যাগ নিয়ে গোপনে পালিয়ে যায় পুরো দল।

বোর্ডের ভেতরের খবর, সেই রাতে নাকি নগদ ৩৫ লাখ টাকা আর গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু ডকুমেন্টস গায়েব করে দেয় জুয়েলের দল। এমন গুরুতর অভিযোগের পরেও এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করেনি নিজামউদ্দিন সুজনের প্রশাসন। তবে জুয়েলের দাবি, সেই রাতে নিজের জামা-কাপড় নিতেই বিসিবিতে এসেছিলেন তিনি।

এমন অভিযোগের পরেও জুয়েলের মাথার ওপর প্রধান নির্বাহীর হাত রয়েছে আগের মতোই। চলতি বছরের জুলাই থেকে টানা পাঁচ মাসে এক দিনও অফিস করেননি এই এক্সকিউটিভ। কিন্তু ঘরে বসেই প্রতিমাসে ৬৬ হাজার ৭৯২ টাকা করে বেতন তুলছেন।

গত বছর রাতের অন্ধকারে রাজনৈতিক চেহারা পাল্টে ফেলা এই সুযোগসন্ধানী জানান, রাজনীতিতে সময় দিতেই নাকি অফিস করছেন না। এই ব্যাপারে অবগত আছেন বিসিবি প্রধান নির্বাহী।

যোগাযোগ করা হলে জুয়েল সরকার এ বিষয়ে স্টার নিউজকে বলেন, ‘আমি যখন নির্বাচনের মনোভাব পোষণ করি, তখন আমি স্যারকে অবগত করি যে, স্যার আমাকে একটু ছাড় দিয়েন। যেহেতু আমি নির্বাচন নিয়ে একটু দৌড়াদৌড়ি করছি। এখন এগুলো নিয়ে কি নিউজ করার এতো ইয়ে.. হয়ে গেছে (হাঁসি)... করেন করেন অসুবিধা নাই।’

জুয়েলের কথার সত্যতা যাচাই করতে গত ১২ ডিসেম্বর যোগাযোগ করা হয় নিজামুদ্দিন সুজনের সঙ্গে। প্রশ্নের উত্তর দিতে না পেরে, দুই এক দিন সময় চেয়ে নেন তিনি। তিনি স্টার নিউজকে বলেন, ‘আপনি খেলার নিউজ করেন? নাকি অন্য নিউজ? এগুলো একটাও তো খেলার না। এগুলো তো চট করে বলতে পারবো না এজন্য। যাইহোক, আমি দেখি তারপর আপনার সঙ্গে কথা বলবো।’

তবে, স্টার নিউজের এক ফোনেই পালটে যায় দৃশ্যপট, পাঁচ মাস অফিস না করা জুয়েল পরের দিনই ছুটে আসেন বিসিবিতে। লম্বা বৈঠক করেন সিইওর সঙ্গে। কিন্তু কোন পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বিসিবিতে এসেছিলেন, তা জানা যায়নি।

জুয়েলের মতো আরেক চরিত্র আমির হোসেন। তিনি ইসমাইল হায়দার মল্লিকের আস্থাভাজন। বোর্ডে তার আমিরি চালচলন ছিল দেখার মতো। জুলাই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার মামলায় শেখ হাসিনার সঙ্গে আসামিও হয়েছেন। এই আমিরও গত সাত মাসে এক দিনও অফিস করেননি। অথচ ঘরে বসে ঠিকই অক্টোবর পর্যন্ত প্রতি মাসে ৪৪ হাজার টাকা করে বেতন তুলেছেন।

প্রধান নির্বাহীর সই ছাড়া তো বেতন তুলতে পারার কথা না। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নিজাম উদ্দিন চৌধুরী সুজন স্টার নিউজকে বলেন, ‘না, আমার পারমিশনের কথা না। এটা প্রসেস হয়ে আসে। আমার কাছে সইয়ের জন্য শুধু একজনেরটা না, পুরো গ্রুপেরটা আসে।’

এদিকে, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিসিবির জিমনেশিয়ামে ট্রেইনার পদে নিয়োগ পান জাহিদুল ইসলাম খোকন। নিয়োগের চার মাস পর বোর্ড থেকে চাকরি পাকা হওয়ার চিঠি পান তিনি। তবে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে কয়েক বছরের মাথায় সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই আচমকায় বন্ধ করে দেওয়া হয় খোকনের বেতন-ভাতা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহিদুল ইসলাম খোকন স্টার নিউজকে বলেন, ‘এক বছর (২০১৪ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত) আমার একটা প্রভিশনাল পিরিয়ড যায়, ২০১৫ সালে আমি পার্মানেন্ট হই। এরপর কোনো নোটিস ছাড়াই হুট করে আমার সেলারি বন্ধ হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে আমি একাধিকবার সিইওর কাছে যাই, তিনি আমাকে এ বিষয়ে কোনো সঠিক ব্যাখ্যা বা সদুত্তর দিতে পারেন নাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তখন আমি উনাকে (সিইও) গিয়ে বলি, আমাকে যদি চাকরিতে নাও রাখেন আমার প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা এবং অ্যাকাউন্ট ক্লোজ করে দিলে আমার জন্য ভালো হয়। আমি ওই টাকা দিয়ে বাবাকে চিকিৎসা করাতে পারি। কিন্তু এ বিষয়েও উনি কোনো কর্ণপাত করেননি।’

খোকন যখন বাবা-মা’র চিকিৎসার জন্য অর্থ চেয়েও পান না, তখন বিসিবি’র প্রতিটি কর্মীর জন্য রয়েছে ইনস্যুরেন্স ব্যবস্থা। যেটা আবার পান গত পাঁচ মাস অফিস না করা জুয়েল সরকার। এভার কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে বিসিবি’র কাছে ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা আবদার করেন জুয়েল। তবে সুজনের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত ৭৫ হাজার টাকার বিল তুলে নেন।

সুজনকে নিয়ে এমন অভিযোগ এবারই প্রথম না, বছরের পর বছর নানা সময়ে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে সুজনের স্বেচ্ছাচারিতার দৃশ্য। শোনা গেছে মাসে পাঁচ লাখ ৭৭ হাজার টাকা বেতনভুক্ত এই কর্তা সম্প্রতি সময়ে নিজের বেতন-ভাতা বাড়াতেও আবেদন করেছেন বোর্ডের কাছে। অথচ বিসিবিতে মাত্র ৫ হাজার ৫০০ টাকায় চাকরি শুরু করেছিলেন তিনি। গেল দুই দশকে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০ গুণের বেশি।

ভিডিও প্রতিবেদন নিচে দেওয়া হলো-


সম্পর্কিত খবর :