গুমচর: যেখানে শেষ হয় গুম হওয়া মানুষদের গল্প (ভিডিও)
২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে এক কালো অধ্যায়। বিডিআর জওয়ানদের বিদ্রোহের নামে সেনা অফিসারদের ওপর চালানো হয় নির্মম হত্যাযজ্ঞ। ওই ঘটনার সময় তৎকালীন বিডিআর হাসপাতালে মেডিকেল টেকনিশিয়ান পদে চাকরি করতেন নজরুল ইসলাম। যখন এই হত্যাকাণ্ড শুরু হয়, তখন তিনি হাসপাতালেই অবস্থান করছিলেন। ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি পিলখানা থেকে পালিয়ে যান। এরপর আর চাকরিতে যোগ দেননি নজরুল।
স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দল খুঁজে বের করে সেই নজরুলের বাড়ি। কথা বলে তার স্ত্রী মুন্নী আক্তারের সঙ্গে। তিনি স্টার নিউজকে জানান, বিডিআর অফিসারদের কিলিং মিশনের প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ায় একটা ভয় কাজ করতো নজরুলের মধ্যে। তাই তিনি আর চাকরিতে যোগ দেননি।
মুন্নী আক্তার স্টার নিউজকে বলেন, ‘আমরা তাকে হাজিরার জন্য (চাকরিতে যোগ দেওয়ার জন্য) বলেছিলাম। বলেছিলাম, কিছু হবে না, কোনো সমস্যা হবে না। তার বোনেও বলেছিল- কিন্তু উনি বলতেন, না আমি চাকরি করবো না। তোমরা ওই জায়গায় সম্পর্কে জানো না। ওখানে গেলে আমাকে মেরে ফেলবে।’
স্টার নিউজের মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা যায়, সবার থেকে নিজেকে আড়াল করতে নাম পরিবর্তন করে ফেলেন নজরুল। এরপর গোপালগঞ্জের একটি হাসপাতালে মেডিকেল টেকনিশিয়ান পদে চাকরি নেন। কিন্তু ২০১০ সালের ১৫ মার্চ বিকেলে ওই ক্লিনিক থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে তাকে তুলে নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নজরুলের স্ত্রী মুন্নী স্টার নিউজকে জানান, পাঁচ থেকে সাতজন লোক সকাল থেকে সেখানে অবস্থান করছিল। অপহরণের সময় হয়তো সে ভেবেছিল, তাকে জেলে দিবে। কিন্তু তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এক বছর পর বাগেরহাটের রায়েন্দা ইউনিয়নের বলেশ্বর নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নজরুলের স্ত্রীমুন্নী আক্তার (স্টার নিউজ)
মুন্নী আক্তার বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত হওয়ার পর (নজরুলের মরদেহ) মরদেহ এখানে এনে দাফন করেছি।’ তাকে কারা অপহরণ করতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তার তো কোনো শত্রু ছিল না। তাকে সরকারি লোকেরাই নিয়ে যায়।’
নজরুলের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তার চাচা হাবিবুর রহমান। তিনি স্টার নিউজকে জানান, নজরুল গুম হওয়ার এক বছর পর বাগেরহাটের রায়েন্দা এলাকায় বলেশ্বর পশ্চিম পাড়ে নদীর পাড় থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অজ্ঞাত হিসেবে বাগেরহাটে দাফনও দেওয়া হয়। পরে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত হন যে এটা নজরুল। এরপর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে জেলা প্রশাসন।
হাবিবুর রহমান বলেন, ‘নজরুলের দুই হাত, দুই পা বাঁধা ছিল। সামনে থেকে পেছনে তিনটা করে প্যাঁচ দেওয়া ছিল। আর পেটটা চাকু দিয়ে কেটে নদীতে ভাসায় দেয়।’
নদীতে নজরুলের মরদেহ পাওয়ার পর একটি অপমৃত্যুর মামলা করে পুলিশ নিজেই। স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দল যোগাযোগ করে সেই বাগেরহাটের শরণখোলা থানায়। সংগ্রহ করে নজরুলের মরদেহের সুরতহাল রিপোর্ট। সেখানকার বর্ণনায় কিছু শব্দে চোখ আটকে যায়। মরদেহের দুই চোখ, দুই হাত, দুই পা দড়ি ও গামছা দিয়ে বাধা। শরীরের সঙ্গে বাঁধা ছিল সিমেন্ট জমানো বস্তা। আর বুক ছিল পুরোটা ছিঁড়ে ফেলা। কিন্তু ডুবিয়ে দেওয়া ইটের বস্তা একটি চরে আটকে যাওয়ায় হত্যার কয়েকদিন পরেই মরদেহ ভেসে ওঠে।
নজরুলের নিখোঁজ, গুম করা এবং পরে মরদেহ পাওয়া নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে কয়েকটি পত্রিকার চোখে পড়ে স্টার নিউজের। ‘দৈনিক পূর্বাঞ্চল’ পত্রিকার একটি খবরের পাশাপাশি ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় ২০১০ সালের ২৪ মে ছাপানো একটি খবর খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ ছিল, ওই সময় সুন্দরবন সংলগ্ন শরণখোলা রেঞ্জে বলেশ্বর নদীর মোহনায় দু/একটি মরদেহ ভেসে থাকার কথা। প্রতিটি মরদেহের সুরতহালের বর্ণনা এক। হাত-পা-চোখ বাধা, গায়ের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া সিমেন্ট জমানো বস্তা।
স্টার নিউজ যোগাযোগ করে সুন্দরবন সংলগ্ন বনবিভাগ, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জেলে সমিতি বা ট্রলার মালিক সমিতির কয়েকটি সূত্রের সঙ্গে। তথ্য নিতে থাকে ১৪/১৫ বছর আগে ভেসে ওঠা এমন মরদেহ সম্পর্কে কেউ কিছু জানেন কি-না। এক পর্যায়ে নজরুলে মরদেহ তদন্ত করেছিলেন পুলিশের যেসব কর্মকর্তা, তাদের একজনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বারবার একটি নাম উল্লেখ করছিলেন, আর তা হলো ‘চরদুয়ানি’। এখানেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক মানুষকে এনে হত্যার পর লাশ গুম করতো।
এ বিষয়ে জানতে অনুসন্ধানী দল কথা বলে পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানি বাজারের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে। শুরুতে অবশ্য কেউ মুখ খুলতে চাননি। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর কথা হয় মো. রিয়াজ নামের এক মুদির দোকানির সঙ্গে।
চরদুয়ানি বাজারের পূর্ব পাশে একটি বড় বরফকল আছে, তার পাশেই আছে ট্রলারঘাট। এই ঘাটের পাশেই প্রায় ২০ বছর ধরে মুদি দোকান পরিচালনা করে আসছেন মো. রিয়াজ। তার কাছে প্রশ্ন ছিল, এই এলাকায় অস্বাভাবিক কিছু হতে দেখেছেন কি-না।
মো. রিয়াজ বলেন, ‘এখানে এসে বলতো যে, আজ রাত ৯টার পর দোকানের বাতি নিভিয়ে চলে যাবা। বাতি জ্বলবে না। রাত ৯টা বাজলে দোকান বন্ধ করে ফেলবা।’ তারা কারা ছিল? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সিভিলের লোক এসে বলতো। তাদের তো আমি চিনি না।’
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে মো. রিয়াজ বলেন, ‘সকালবেলা দোকান খুলতাম। দেখতাম ৯টা-১০টার দিকে তারা লাশ নিয়ে আসছে। তখন ব্রিজের ওপর মানুষের ভিড় থাকতো। কেউ দেখাদেখি করে। কেউ অস্ত্র বাইরে উঠে-নামে ওঠে-নামে।’
জানা গেছে, ২০১০ সালের পর থেকে এখানে কালো গ্লাসে করে মাইক্রোবাস আসা শুরু করে। যখন আসতো তখন সব দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হতো। ভয়ে সবাই বাজার-ঘাট বন্ধ করে বাড়িতে লুকিয়ে থাকতো। রিয়াজের দোকানের সামনে দিয়েই মাইক্রোবাসে করে এনে লোক উঠানো হতো ট্রলারে।
চরদুয়ানি বাজারেরট্রলারঘাট (স্টার নিউজ)
এ বিষয়ে জানতে স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দল কথা বলে চরদুয়ানি বাজারের আরও বেশ কয়েকজনের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় বারবার এক জেলের নাম সামনে আসে। তার নাম জলিল। চরদুয়ানি খাল ধরে বলেশ্বর নদীর অংশে যাওয়ার পর দেখা মেলে সেই জলিলের।
জানা যায়, একটা সময় র্যাবের সোর্স হয়ে কাজ করতেন জলিল। নিজের চোখে দেখেছেন কীভাবে বিভিন্ন এলাকা থেকে মুখোশ পরিয়ে মানুষ এনে হত্যার পর লাশ বলেশ্বর নদীতে ফেলা হতো।
একটি ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আব্দুল জলিল স্টার নিউজকে জানান, ওই দিন নৌকায় তার সঙ্গে আরও দুইজন ছিলেন খোকন এবং আব্বাস। জলিল বলেন, ‘প্রথম অপারেশনে আমি যেটা দেখেছি, ওরা দুইজন লোক আনে। বোটে দুইজন লোক আনার পরে বলে যে, তোমরা সব পেছনে যাও। পেছনে যাওয়ার পরে তারা ইট, বস্তা এগুলো বের করে। আমরা তিনজন তখন বলাবলি করতাম, এগুলো করবে কী! আব্বাস বলতো, যা মন চায় করুক তোরা কথা বলিস না। এরপর ছয়টা গুলি হয়। প্রথম গুলিতেই আমরা ভয় পেয়ে যাই। আব্বাস তখন আবারও বলে, মানুষ মেরে নদীতে ফেলতেসে, কথা বলিস না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওই অপারেশন হয়ে যাওয়ার পর আব্বাসকে বলে যে, আব্বাস বোট চালাও চরদুয়ানি। আর তোমরা খোকন-জ্বলিল এদিকে সামনে আসো। এরপর আমরা সামনে যাওয়ার পর বলে, এগুলো (রক্ত) সব ধুয়ে ফেলো। তারা সঙ্গে করে ব্রাশ-ওয়াশিং পাউডার নিয়ে আসে। প্রথম আনে দুইজন, এরপর আনে তিনজন।’
তিনি জানান, মোট তিনটা ট্রলার থাকতো। একটাতে জলিলদের রাখা হতো অন্যটাতে অফিসাররা থাকতো।
জলিলের সঙ্গে কথা বলে আরও কিছু নাম পায় অনুসন্ধানী দল। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সবাই পাথরঘাটার চরদুয়ানি এলাকার বাসিন্দা।
২০১০ থেকে প্রায় চার বছর ধরে যার ট্রলারে করে গুম করা ভুক্তভোগীদের বলেশ্বর নদীতে নেওয়া হতো তিনি আব্দুর রহমান। যিনি এলাকায় ‘ফাটা রহমান’ নামে পরিচিত। তিনি নিজেই ট্রলারের মালিক, আবার নিজেই চালাতেন। নিজের চোখে দেখেছেন, মুখোশ পরানো এক একটি দেহ কীভাবে গুলি করে বা শ্বাসরোধ করে হত্যার পর হাত-পা বেধে, বুক চিরে, শরীরের সঙ্গে সিমেন্ট-পাথরের বস্তা বেধে নদীতে ভাসানো হতো।
ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে আব্দুর রহমান স্টার নিউজকে বলেন, ‘এগুলো আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমার বোট আমি চালাইতাম। চালাবার পরে তারা বলতো, বোট স্লো করো। বোট স্লো করলে এই কাজ তারা শুরু করতো।’
আব্দুর রহমান আরও বলেন, ‘বোটের সাপোর্ট (তক্তা) আছে। সাপোর্টের ওপরে মাথা রাইখা দুইজনে মাথা উঠাই দিতো। এরপর গুলি করে করে মানুষগুলো ফেলে দিতো গভীর সাগরে। গলায় বস্তা বাঁধত। ওই যে পাথরগুলা উঠাইছে ওই একটা বস্তা গলায় বাঁধত একটা পায়ে বাঁধত। অনেক সময় শাহ আলমকে অর্ডার করতো যে, বুক ফাইড়ি (ছিঁড়ে) দাও। এরপর ফেলে দিতো।’
স্টার নিউজ আব্দুর রহমানের কাছে জানতে চায়, গুম অপারেশনে যোগ দেওয়া কোনো অফিসার বা জড়িত কাউকে তিনি চেনেন কি-না। এরপর এক পর্যায়ে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের ছবি দেখিয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, তাকে চেনেন কি-না। আব্দুর রহমান জানান, জিয়াউল আহসানকে তিনি দেখেছেন। ব্রিজের ওপর তিনি থাকতেন।
চরদুয়ানি এলাকা অনুসন্ধান করতে করতে গিয়ে স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দল খোজ এমন একজনকে খুঁজে পায়, যিনি নিজেই মৃত্যুর কোল থেকে ফিরে এসেছেন। তার নাম জসীম উদ্দিন। পাথরঘাটার এই বাসিন্দা বরগুনায় কলেজে পড়ার সময় স্থানীয় এক সোর্সের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব হয়। পরে, এক দিন বাসায় ফেরার সময় কালো কাপড় বেঁধে তুলে নেওয়া হয় তাকে। মুখোশ পরিয়ে ট্রলারে করে নিয়ে যাওয়া হলেও, হত্যা করা হয়নি। চার/পাঁচ দিন ট্রলারে ঘুরিয়ে বনদস্যু হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হয় তাকে।
ওই ঘটনার সম্পর্কে জানতে চাইলে জসীম স্টার নিউজকে বলেন, ‘সিভিলে তুলে নিয়ে আমাকে বরিশাল র্যাব-৮-এ রাখে। সেখানে আমাকে তিন থেকে চার দিন রাখে।’
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রুহিতা চরে আমিসহ আরও কয়েকজন নামায়। আমার হাত-পা-চোখ বাঁধা ছিল। অনুমান করতে পেরেছিলাম যে, আমার সঙ্গে আট থেকে ১০ জন আরও নামাইছে। আর র্যাবের ডিওডি ছিল কামরুল ইসলাম। উনিসহ উনার ফোর্স ছিল। আমি যখন নামি, তার আগে ফায়ারিং-এর শব্দ পাই। আমার সাথে বাকি যারা ছিল সম্ভবত তাদের মেরে ফেলেছিল।’
বলেশ্বর নদীর খাল (স্টার নিউজ)
তিনি জানান, ভুক্তভোগীদের রাখা হতো ট্রলারের খোপের (মালামাল রাখার জায়গা/ইঞ্জিন রুম) ভেতর। এ সময় তিনি দেখানোর চেষ্টা করেন কীভাবে ট্রলারে মানুষকে হত্যা করা হতো।
জসীম উদ্দিন বলেন, ‘হাত-পা বেঁধে ট্রলারের সাপোর্টের (তক্তা) ওপর ফেলে মাথায় গুলি করতো। এরপর হাতের বাঁধনের জায়গায় একটা সিমেন্টের ব্যাগ, আর পায়ের বাঁধনের সঙ্গে একটা সিমেন্টের ব্যাগ বাঁধত। এরপর পেট কেটে ফেলে দেওয়া হতো।’
কেন পেট কেটে ফেলে দেওয়া হতো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যাতে ভেসে উঠতে না পারে সেজন্য। কারণ এদিকে জেলেরা নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরে, জালে যাতে উঠতে না পারে।’
প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে দুই থেকে তিনটি নাম পায় স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দল। যারা এলাকায় র্যাবের প্রভাবশালী সোর্স হিসেবে পরিচিত ছিল। তারা হলেন- অলি জাফর, আল-কাছ মল্লিক এবং শাহ আলম। এরমধ্যে অলি জাফর মারা গেছেন ২ থেকে ৩ বছর আগে। শাহ আলম এলাকা ছাড়া বহুদিন ধরে, আর আলকাছ মল্লিক ২০১১ সাল থেকে নিখোঁজ।
তাই স্টার নিউজ খুঁজে বের করে আলকাছের বাড়ি। পাথরঘাটার চরদুয়ানি ইউনিয়নের দক্ষিণ চরদুয়ানি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। স্বামী আলকাছের নিখোঁজের পর তিন সন্তানকে অনেক কষ্টে মানুষ করেছেন জাকিয়া বেগম। নিজেও ১৪ বছর ধরে কোনো রকমে বেঁচে আছেন। স্টার নিউজ তার কাছে জানতে চায়, কেন তার স্বামী নিখোঁজ হলেন?
জাকিয়া বেগম বলেন, ‘তাকে র্যাব ধরে নিয়ে যায়, এরপর আর ফিরে আসেনি।’
আলকাছ মল্লিকের পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় স্টার নিউজ জানতে পারে তারই আপন ছোট ভাই আব্বাস মল্লিকের সম্পর্কে। আলকাছের হাত ধরে আব্বাসও র্যাবের সোর্স হয়ে কাজ করতেন। আব্বাস জানান, আনুমানিক ২০১৭/১৮ সালের পর গুম অপারেশন বন্ধ হয়ে যায়। তখন, ঊর্ধ্বতন অফিসারদের অনুরোধ করে সোর্স থেকে কর্মচারীর চাকরি পান আব্বাস। সর্বশেষ ছিলেন র্যাব-৮ ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরের মালী। আব্বাসও অন্য সোর্সদের মতো নিজ চোখে দেখেছেন কীভাবে গুম করে আনা ভুক্তভোগীদের লাশ ডুবিয়ে দেওয়া হতো।
আব্বাস মল্লিক স্টার নিউজকে বলেন, ‘ট্রলারে আমরা তিনজন থাকতাম। আমি জলিল আর খোকন। তারা রাতে এসে বোট নিত অপারেশন করতো। লোকজন নিয়ে মেরে নদীতে ফেলে দিত। দুইজন-তিনজন থেকে সর্বোচ্চ নয়জন নিয়ে আসতো।’
আব্বাসের কাছ থেকে আরেকটা তথ্য পাওয়া যায়, ২০১০ থেকে চার বছর ধরে আব্দুর রহমানের মতো কারো থেকে ট্রলার ভাড়া নিয়ে নদীর মধ্যে গুম-খুন অপারেশনে যেতো র্যাব। ২০১৪ সালে পাথরঘাটা মাছ ব্যবসায়ী সমিতি ৬০ ফুটের বিশাল আকারের ট্রলার উপহার দেয় র্যাবকে। এরপর থেকে ওই ট্রলারে করেই গুমের ভুক্তভোগীদের নেওয়া হতো। তবে ২০১৭/১৮-এর দিকে গুম অপারেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ওই ট্রলার চরদুয়ানি ঘাটেই বাধা থাকতো। একসময় অব্যবহৃত হয়ে নষ্ট হয়ে যায় সেই ট্রলার।
গুম ভুক্তভোগীদের যাদের লাশ নদীতে ফেলা হতো তাদের বলা হতো প্যাকেট। আব্বাস নিজ চোখে দেখেছেন কোন কোন অফিসার সেসব অপারেশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে নেমে স্টার নিউজ টিমের কাছে একটা বিষয় খটকা লাগে, র্যাবের সোর্স ছিলেন বা এলাকার জেলে, ট্রলার মালিক, ব্যবসায়ী, দোকানদার তারা কি সত্য বলছেন? সেটা তো যাচাই করতে হবে। ফলে স্টার নিউজ শরণাপন্ন হয় চরদুয়ানির দুই জনপ্রতিনিধির। তারা হলেন- স্থানীয় সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য মিজানুর রহমান এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম। দুইজনের বক্তব্য একই, বছরের পর বছর ধরে মুখোশ পরিয়ে মানুষ এনে হত্যা বা বন্দুকযুদ্ধ দেখানো ছিল একেবারে ওপেন সিক্রেট। কিন্তু ভয়ে কেউ কখনোই মুখ খোলেননি।
চরদুয়ানির সাবেক ইউপি সদস্য মিজানুর রহমানের দাবি, এলাকায় র্যাবের প্রথম সোর্স যারা ছিলেন সেই জাফর, আলকাছ ও শাহ আলমের সঙ্গে তিনিই দুই অফিসারের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘ওদের একটিভিটিসের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারতাম, অপারেশন হবে আজ। ওরা নিজেরাই বলতো, আজ বড় স্যার আসবেন অনেক কাজ আছে। ওদের আয়োজন-দাফাদাফি দেখেই আমরা সব বুঝে যেতাম।’
চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম বলেন, ‘তারা যখন আসতো, তখন দুই থেকে তিনটা ট্রলার যেত। র্যাবের মধ্যেই দুই তিনটা গ্রুপ থাকতো অর্থাৎ ঢাকা থেকে একটা টিম আসতো বরিশাল-৮ থেকে আরেকটা আসতো আর স্থানীয় যে র্যাবের সোর্স, তাদের মাধ্যমে কাজগুলো হতো বরগুনার পাথরঘাটা হয়ে।’
সুন্দরবনের এই অংশে শুধু যে মানুষজন এনে ঘুম করা হতো তা কিন্তু নয়। এখানে বন্দুকযুদ্ধও দেখানো হতো। জলদস্যু, বনদস্যু, ডাকাত, অস্ত্র উদ্ধার এইসব করা হতো এই জঙ্গলে। মাঝ নদীতে বা একেবারে সাগরমুখ মোহনায় ফেলা হতো গুম করা লাশ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের থেকে বর্ণনা শুনে স্টার নিউজ জানতে পারে, ঢাকা বা বরিশাল থেকে ঘুমের ভুক্তভোগীদের নিয়ে র্যাবের গাড়িবহর আসতো ভান্ডারিয়া হয়ে মঠবাড়িয়া পাথরঘাটা সড়ক ধরে চরদোয়ানি বাজারে। সেখানে বাজারের পাশেই বরফকলের সামনে তারা গাড়ি রাখতো। বরফকলের সামনে থেকে ট্রলারে উঠে সোজা বলেশ্বর নদীতে।
চরদোয়ানি খাল থেকে নদীর মোহনা, এরপর দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা ট্রলার চললেই বঙ্গোপসাগরের মোহনা। নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছানোর পর কোনো কোনো সময় শুরু হতো মহড়া। স্থানীয়দের বন্দুকযুদ্ধ বোঝানোর জন্য বেশ কিছুক্ষণ ধরে ফাঁকা গুলি ছোড়া হতো। ঠিক যখন নদীতে ভাটা নামতো তখন ঘুমের ভুক্তভোগীদের মরদেহ ফেলে দেওয়া হতো, যাতে তা গভীর সমুদ্রের মাঝে ভাটা ধরে চলে যায়।
লাশ এখানেই কেন ফেলা হতো? এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল জেলে আব্দুল জলিলের কাছে। তিনি জানান, এখানে গভীর পানি, তাই এখানেই লাশ ফেলা হতো। যাতে ভাটার সময় চলে যায়।
গুমের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুর রহমান স্টার নিউজকে জানান, তার মরে প্রায় ২০০ মানুষকে এভাবে হত্যার পর গুম করা হয়েছে।
ঢাকায় একটি প্রোডাকশন হাউজের ভিডিও নির্মাণের কাজ করেন আমিনুল ইসলাম সুজন। ২০১১/১২ সালে তিনি একদিন গ্রামের বাড়িতে গিয়ে শোনেন এলাকায় মাঝে মাঝে অপারেশনে আসে কোনো একটি বাহিনী। নিয়মমতো সবাই বাজার অন্ধকার করে ঘরে ফিরে গেলেও ঘাটের পাশে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে ভুক্তভোগীদের নিয়ে যেতে দেখতেন সুজন।
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি স্টার নিউজকে বলেন, ‘এখানে একটা ঝোপ ছিল। আমি মাছ ধরার ছলে একটা ছোট ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে এখানে বসে থাকতাম। তখন দোকানপাটও খুব একটা ছিল না এখানে। এই ঝোপের ভিতরে বসে আমি দেখতাম হাত বাঁধা অবস্থায় মানুষকে কীভাবে ট্রলারে তোলা হতো।’
স্থানীয়দের থেকে জানা যায়, এই এলাকায় শুধু অপারেশন চালিয়েই শেষ হতো না। মাঝরাতে স্থানীয়দের ঘুম থেকে তুলে ঘটনাগুলোতে সাক্ষী করা হতো। সাক্ষী হিসেবে নাম ওঠার পর অনেকটা আতংকে থাকতেন মানুষ। তাদেরই একজন স্থানীয় জেলে মো. জাহাঙ্গীর। তিনি এমন একটি ঘটনার সাক্ষী। তাকে ভোররাতে ডেকে বন্দুকযুদ্ধে নিহতদের সুরতহালের সাক্ষী হতে বলা হয়।
মো. জাহাঙ্গীর স্টার নিউজকে বলেন, ‘পায়ের দিয়ে যখন আমি তাকাই, প্রত্যেকটা নখ মানুষের চেহারা চিনায়। কারণ যারা জঙ্গলে হাঁটাচলা করে, তাদের নখে ময়লা থাকে। চেহারা চিনাইবে না। তখন আমার মনে একটু কামড় দেয় যে, মনে হয় এরা ডাকাত না। কারণ এত সুন্দর নখ কোনো ডাকাতের হবে না।’
জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথা বলে বুঝা যায়, লাশগুলো দেখে তার কাছে কখনো ডাকাত মনে হয়নি। তিনি নিশ্চিত এরা শহরের মানুষ। তাদের হাত পা ছিল খুব পরিষ্কার। শরীরে কোনো দাগ নেই। কাপড়ও উন্নত।
র্যাবের সোর্স হয়ে কাজ করা প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় তৎকালীন র্যাবে কর্মরত বেশ কয়েকজনের নাম এসেছে স্টার নিউজের হাতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাম এসেছে র্যাবের সাবেক গোয়েন্দা পরিচালক ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান। তিনি বর্তমানে কারাগারে। এছাড়া, র্যাব-৮ এর সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার নামও উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। এরমধ্যে দুইজন এখন চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন।
গুম ও তারপর হত্যার সঙ্গে জড়িত যে কজনের নাম স্টার নিউজের হাতে এসেছে, তাদের নিয়ে তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। স্টার নিউজ সেই দলের নামগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চায়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় তদন্তের স্বার্থে স্টার নিউজকে সব আসামির নাম প্রকাশ না করতে অনুরোধ জানানো হয়। তবে স্টার নিউজ নিশ্চিত হয়েছে, র্যাব-৮ এ কাজ করা সাবেক দুই উর্ধতন কর্মকর্তা চরদুয়ানি ঘাট থেকে যে বলেশ্বর নদীতে লাশ ফেলা হতো। তার পুংখানুপংখু বর্ণনা দিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়েছেন।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর শেখ মাহদী স্টার নিউজকে বলেন, ‘আমাদের ধারণা, ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের প্রায় সবার নামই আমরা অনুসন্ধান করে পেয়েছি। এদের মধ্যে অফিসার লেভেলের বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অস্বীকার করেছেন, আবার কেউ কেউ একদম সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। এরকম বেশ কয়েকজন অফিসার এবং সৈনিক আমাদের তদন্তকারী দলের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে, তারা এই ধরনের কাজগুলো চাপে পড়ে বা চাকরির কারণে করেছিলেন।’
বলেশ্বর নদী এবং গুমচর (স্টার নিউজ)
স্টার নিউজের অনুসন্ধানের পর চরদুয়ানি এলাকার এসব প্রত্যক্ষদর্শী, জবানবন্দী দিয়েছেন অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছেও।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মঈনুল করিম বলেন, ‘যাকে ফাঁসি দেওয়া হয় সেও জানতে পারে যে, একটু পর তার মৃত্যু হবে। মৃত্যুর আগে সে তার ফ্যামিলি সবার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পায়। কিন্তু এইখানের মানুষটার (গুমের শিকার) অবস্থাটা কি? সে তার ফ্যামিলির তো দেখা পায় না। তার ফ্যামিলি জানেও না কোথায় সে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এস এম তাসমিরুল ইসলাম স্টার নিউজকে বলেন, ‘২০১০/১১ থেকে ঘুমের যেই সংস্কৃতি আমরা দেখতে পাচ্ছি, মানুষ নাই হয়ে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর নাই হয়ে যাচ্ছে।’
আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়া কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে চরদুয়ানি এলাকায় গুম করে এনে মরদেহ ভাসানো হতো। কিন্তু, ২০২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে বন্ধ হয়ে যায় এসব কথিত অপারেশন। এরপর থেকে এই এলাকার জেলেদের কাছে বলেশ্বর নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনার এই মাঝের চর পরিচিত `’গুমচর’’ নামে। এমনকি গুগল ম্যাপেও এই ‘গুমচর’ শব্দটার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।
শুধুই কি বরগুনার এই জায়গায় গুমের মরদেহ ফেলা হতো? নাকি আরও জায়গা আছে? এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদী আছে, কর্ণফুলী নদী, বঙ্গোপসাগর আর আপনি যে, এলাকার কথা বলছেন সেগুলো। আমরা ধরে নিতে পারি, যে মানুষগুলো ফিরে আসেনি, তাদের পরিণতি এরকমই কোনো একটা স্পটে ঘটে গেছে।’
নদী, সাগর, পাহাড়, জঙ্গল যেখানেই মরদেহ গুম করা হোক, একটি একটি গুম একজন করে নজরুলের পরিবারের গল্প। নজরুলের মেয়ে নীলিমা ইসলাম জেরিনের বয়স যখন চার, তখন তার বাবাকে গুম করা হয়। এখন জেরিনের বয়স ১৭। বোঝার বয়স থেকে পিতৃহারা জেরিন চান তার বাবার মতো প্রতিটি হত্যার বিচার হোক।
গুম-খুনের ভুক্তভোগী সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুলের মেয়ে স্টার নিউজকে বলেন, ‘সুষ্ট একটা বিচার হোক। আইনের আওতায় আনা হোক। আমার মত তো অনেক ছেলে-মেয়েই তাদের বাবা হারাইছে। বাবার আদর-ভালোবাসা তারা কিছুই পায় নাই।’
ভুক্তভোগীদের আরও চাওয়া, যে সুন্দরবন শত ঝড়-ঝঞ্ঝায় বাংলাদেশকে বাঁচাতে বুক পেতে দেয়, সেই বন যেন আর কোনো বীভৎস ঘটনার সাক্ষী না হয়। যে রাষ্ট্র পরিচিত নদীমাতৃক দেশ হিসেবে, সে দেশের নদীর বুকে জেগে ওঠা আর কোনো চরের নাম না হোক ‘গুমচর’।