জালিয়াতির কারখানা ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ভিডিও)
জাল সনদ, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ, ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ, সরকারি স্বীকৃতিবিহীন সনদ, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ছাড়াই ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকরি করছেন কয়েক ডজন কর্মকর্তা। যাদের অন্তত ৮০ জন প্রথম শ্রেণি পদে কর্মরত। এ পদগুলোর মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় প্রশিক্ষক, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, প্রকাশনা কর্মকর্তা, সহকারী সম্পাদক, সহকারী লাইব্রেরিয়ান, আর্টিস্ট, সহকারী পরিচালক ও পরিচালকসহ বেশকিছু পদ।
প্রতিষ্ঠানটিতে কখনো এক পদের বিপরীতে নিয়োগ দেওয়া হয় দুজন কর্মকর্তাকে এবং তাদের দুজনকেই নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে। জাল সনদে নিয়োগপ্রাপ্তদের সরকারের রাজস্ব খাত থেকে বেতন ভাতা দেওয়া হচ্ছে। অবসরের পর তারা পেনশনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও প্রাপ্য হবেন।
সরকারি নীতিমালা অনুসারে, যেকোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের পর নিয়োগপ্রাপ্তদের সনদ যাচাই করা এবং তা সনদ ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর বিধান রয়েছে। কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশনে তা কখনোই অনুসরণ করা হয় না। ফলে প্রতিষ্ঠানটি জাল সনদধারীদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে।
স্টার নিউজের মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে নিয়োগে ভয়ঙ্কর জালিয়াতির তথ্য-প্রমাণ। অনুসন্ধান বলছে, এমন অন্তত ৮০ জন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা বছরের পর বছর ধরে রাজস্বখাত থেকে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন; তবে এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ধর্ম মন্ত্রণালয়। এভাবে জালিয়াতি করে বছরের পর বছর চাকরি করায় বঞ্চিত হয়েছেন প্রকৃত মেধাবীরা।
ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার, মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা ও মানবিক উন্নয়ন সাধনে ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশন। মসজিদভিত্তিক সমাজ উন্নয়ন কার্যক্রম, রমজান ও হজ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা এবং জনকল্যাণে আদর্শ সমাজ গঠনে কাজ করছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এমনকি ইমাম-খতিব ও মুয়াজ্জিনদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করে সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এই প্রতিষ্ঠান।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনে রাজস্ব ও উন্নয়ন খাতে কাজ করছেন প্রায় আড়াই হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারি। যেখানে অনিয়ম-দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। গবেষণা কর্মকর্তা পদে নিয়োগ বঞ্চিতদের একজন কুষ্টিয়ার রেজাউল করিম। যিনি ১৩ বছর ঘুরেও চাকরি পাননি।
২০১২ সালে গবেষণা কর্মকর্তা পদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকরির আবেদন করেন কুষ্টিয়ার রেজাউল করিম। তিনি স্টার নিউজকে জানান, অভিনব জালিয়াতির মাধ্যমে তাকে বাদ দেয়া হয়। এ বিষয়ে বারবার কথা বললেও চাকরি ফেরত পাননি তিনি।
রোজাউল করিমের অভিযোগের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামে স্টার নিউজ। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কার্যালয়ে এসব বিষয়ে তথ্য জানার চেষ্টা করে স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দল। যদিও অস্বীকৃতি জানান সেখানকার কয়েকজন কর্মকর্তা। পরে পরিচয় গোপন রেখে এগিয়ে আসেন একজন; তুলে দেন ফাউন্ডেশনের নিয়োগ সংক্রান্ত বেশ কিছু নথি।
এসব নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, জালিয়াতি এবং বিভিন্ন কারসাজির মাধ্যমে নিয়োগের নানান তথ্য। এর মধ্যে একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স সার্টিফিকেটে চোখ আটকায়। তথ্য অনুযায়ী, এই সার্টিফিকেট জাল করে ২০১৫ সালে সহকারী সম্পাদক পদে চাকরি নেন ফখরুল আলম নামের একজন।
গাজীপুরে অবস্থিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সনদটি যাচাই করে দেখা যায়, সেটি জাল। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকও বিষয়টি স্টার নিউজকে নিশ্চিত করেছেন; অথচ এই সনদ দিয়ে ১০ বছর ধরে চাকরি করছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনে।
কে এই ফখরুল আলম? সেটিও খুঁজে বের করে স্টার নিউজ। প্রকৃত নাম ফখরুল আলম হলেও নিজেকে পরিচয় দেন শায়েখ ফখরুল আলম আশেকী নামে। অনার্সের সার্টিফিকেট জাল হলেও দাবি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। বিভিন্ন এলাকায় ওয়াজ-নসিহতও করেন এই ফখরুল আলম। টেলিভিশন অনুষ্ঠানে উপস্থাপনার পাশাপাশি দুর্নীতিবিরোধী বয়ানের কারণে বেশ সাড়াও পেয়েছেন। এ বিষয়ে ফখরুল আলমের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হয়; কর্মস্থলে না পাওয়ায় কথা হয় মুঠোফোনে।
ফখরুল আলম স্টার নিউজকে বলেন, ‘আমি চ্যালেঞ্জ করবো, এ বিষয়ে পরে কথা বলবো ভাই।’ জালিয়াতি করেও অনুশোচনা নেই তার, যদিও এ নিয়ে পরে আর কথা বলেননি তিনি। স্টার নিউজের অনুসন্ধান চলাকালে সাময়িক বরখাস্ত হন ফখরুল আলম।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে পাওয়া নথিতে আরেকটি জালিয়াতির তথ্য মেলে। বিজ্ঞপ্তিতে, ধর্মীয় প্রশিক্ষক পদে শিক্ষাগত যোগ্যতায় কামিল ডিগ্রী চাওয়া হয়। কিন্তু সাধারণ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী দিয়ে প্রথম শ্রেণীর চাকরি বাগিয়ে নেন জুবায়ের আহমেদ। চাকরি পেতে দাখিল করেন নামমাত্র অভিজ্ঞতা সনদ। এ বিষয়ে জুবায়ের আহমেদ আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি। বিষয়টি চেপে যাওয়ারও অনুরোধ করেন তিনি।
কামিল সনদ না থাকায় জুবায়ের আহমেদের নিয়োগ আইনসংগত হবে না বলে- সে সময়ই উল্লেখ করেন নিয়োগ কমিটির তৎকালীন সদস্য সচিব এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সচিব অহিদুল ইসলাম। যার অভিযোগের সূত্র ধরে অনুসন্ধান শুরু সেই রেজাউল করিম নিয়োগবঞ্চিত হয়ে ১৩ বছর ধরে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। কিন্তু কোনো সুরাহা পাননি। তার জায়গায় গবেষণা কর্মকর্তা পদে চাকরি করছেন সাদিয়া শারমিন নামের একজন।
নিয়োগ বঞ্চিত রেজাউল করিমের নম্বরপত্রে দেখা যায়, রেজাউল ৭১ নম্বর পেয়ে প্রথম হন। কিন্তু শিটে ১০ কমিয়ে তার নম্বর দেখানো হয় ৬১। এই নম্বর জালিয়াতির মাধ্যমেই পরীক্ষায় প্রথম হয়েও বঞ্চিত হন রেজাউল করিম; আর তার জায়গায় কম নম্বর পেয়ে গবেষণা কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পান সাদিয়া শারমিন।
সাদিয়া শারমিন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত। বক্তব্য জানতে তারও মুখোমুখি হয় স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দল। তিনি বলেন, ‘আমি সুবিধাভোগী ঠিক আছে, কিন্তু আমাকে কর্তৃপক্ষ এখানে বসাইছে, তাই চাকরি করছি। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবে।’
পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়েও নিয়োগ পান সাদিয়া শারমিন; যিনি ১৩ বছর ধরে ভোগ করছেন বেতন-ভাতাসহ সরকারি সুযোগ-সুবিধা।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিয়োগে জালিয়াতির আরেক প্রমাণ সহকারী পরিচালক হীরন ব্যাপারী। যিনি লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর পেলেও মৌখিক পরীক্ষায় শতভাগ নম্বর দিয়ে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। হিরণ ব্যাপারীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনিও আনুষ্ঠানিক কথা বলতে রাজি হননি। হীরন ব্যাপারী কথা বলতে না চাইলেও, আশ্চর্যের বিষয় হলো একই পদ্ধতিতে সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ পেয়েছেন আরও ৮ জন।
স্টার নিউজের হাতে আসা নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ইসলামিক ফাউন্ডেশনে অন্তত ৮০ জন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা বিভিন্ন পদে জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন। যারা গত ১৫ বছর ধরে বেতন-ভাতাসহ সরকারি সুবিধা পেয়ে আসছেন। টাকার অংকে যা প্রায় শত কোটি। তবে ফাউন্ডেশনের আরেকটি সূত্র বলছে, জালিয়াতির নিয়োগপ্রাপ্তদের এই সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যাবে।
প্রশ্ন হলো ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে এমন ভয়ংকর জালিয়াতি হলো কীভাবে? সেটিও খুঁজে বের করে স্টার নিউজ। তৎকালীন নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন ফাউন্ডেশনের সচিব রেজাউল করিম। নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব হওয়ায় অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী রেজাউল করিম। তিনি স্টার নিউজকে বলেন, ‘পুরোটাই জালিয়াতি, এ নিয়োগ অবৈধ। পরীক্ষার খাতা-কাটছাঁট করে আলাদাভাবে অনেকের পরীক্ষাও নেওয়া হয়েছে; এ নিয়োগ জালিয়াতি করে দেওয়া হয়েছে। এজন্য আমি কার্যবিবরণীতে স্বাক্ষর করিনি।’
কাগজপত্রের তথ্য বলছে, মূলত ৬ ধরনের কারসাজির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়। প্রথমত; জাল সনদ এমনকি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সনদ ছাড়াই নিয়োগ। দ্বিতীয়ত; নম্বর টেম্পারিং এবং পেন্সিল দিয়ে নম্বর কারসাজি। তৃতীয়ত; লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বরপ্রাপ্তদের মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর দিয়ে নিয়োগ। চতুর্থত; লিখিত পরীক্ষায় বেশি নম্বর প্রাপ্তদের অনেককে মৌখিকে কম নম্বর দিয়ে ফেল করানো। পঞ্চম; জেলা কোটায় ভুয়া নিয়োগ ষষ্ঠ; নিয়োগ দিতে একাধিক কার্যবিবরণী তৈরি করা হয়।
এসব নিয়োগ নিয়ে কী ভাবছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন? সার্বিক বিষয়ে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক। তিনি স্টার নিউজকে বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছি। যারা জালিয়াতি করে নিয়োগ পেয়েছেন বিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।’
ভিডিও প্রতিবেদন দেখুন এখানে...