ফোন স্ক্রলিংয়ের নেশা থেকে মুক্তির উপায়
স্মার্টফোন এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজ, যোগাযোগ, বিনোদন সবকিছুই এক ডিভাইসের ভেতরে। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালেই ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে এক নীরব আসক্তি, অকারণে ফোন স্ক্রলিং।প্রয়োজন না থাকলেও বারবার মোবাইল ফোন হাতে নেওয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় একের পর এক ভিডিও বা পোস্ট দেখা, সময়ের হিসাব না থাকা এই অভ্যাস এখন অনেকের জীবনযাপনের অংশ হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে মনোযোগ, মানসিক স্বাস্থ্য ও সম্পর্কের ওপর।
মোবাইল ফোন স্ক্রলিংয়ের নেশা মূলত মস্তিষ্কের ডোপামিনের সঙ্গে জড়িত। নতুন নোটিফিকেশন, লাইক বা ভিডিও মস্তিষ্কে ক্ষণিকের আনন্দ তৈরি করে। সেই আনন্দ বারবার পাওয়ার আশায় মানুষ অজান্তেই ফোনের দিকে হাত বাড়ায়। ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং বাস্তব জীবনের ছোট আনন্দগুলো আর ততটা আকর্ষণীয় মনে হয় না। ফলে কাজের ফাঁকে, পড়ার সময়, এমনকি পরিবারের সঙ্গে বসেও ফোন স্ক্রলিং চলতেই থাকে।
এই অভ্যাস থেকে মুক্তির প্রথম ধাপ হলো নিজের সমস্যাটি স্বীকার করা। অনেকেই বলেন, ‘আমি তো সময় পেলেই ফোন দেখি’—কিন্তু সময় পাওয়ার বদলে ফোন দেখতেই মূলত সময় তৈরি হয়ে যায়।
দিনে কতক্ষণ মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন, কোন অ্যাপে সবচেয়ে বেশি সময় যাচ্ছে এই হিসাব রাখা খুব জরুরি। এজন্য স্ক্রিন টাইম বা ডিজিটাল ওয়েলবিইং ফিচার ব্যবহার করে নিজের অভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হওয়া যেতে পারে।
মোবাইল ফোন স্ক্রলিং কমানোর একটি কার্যকর উপায় হলো নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা। সারাদিন এলোমেলোভাবে ফোন ব্যবহারের বদলে ঠিক করে নেওয়া যেতে পারে দিনে কখন সোশ্যাল মিডিয়া দেখবেন, কতক্ষণ দেখবেন।
ঘুমানোর আগে অন্তত এক ঘণ্টা ফোন ব্যবহার না করার অভ্যাস গড়ে তুললে ঘুমের মানও ভালো হয়, মনও শান্ত থাকে।
নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ করাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিলে বারবার ফোন ধরার প্রবণতা কমে যায়। ফোনকে সব সময় চোখের সামনে না রেখে ব্যাগে বা অন্য ঘরে রেখে কাজ করার চেষ্টা করা যেতে পারে। ছোট এই পরিবর্তনগুলোই বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
মোবাইল ফোন স্ক্রলিংয়ের জায়গায় বিকল্প অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি। অবসর সময়ে বই পড়া, গান শোনা, হাঁটতে বের হওয়া, ডায়েরি লেখা বা পরিবারের সঙ্গে কথা বলার মতো অভ্যাস মনকে ধীরে ধীরে ফোন থেকে দূরে সরিয়ে আনে। শুরুতে ফোনের প্রতি টান থাকলেও ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের এই কাজগুলোই আনন্দের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের সঙ্গে ধৈর্য রাখা। হঠাৎ করে মোবাইল ফোন ব্যবহার একেবারে বন্ধ করা সম্ভব নয়, আবার সেটি প্রয়োজনও নেই। লক্ষ্য হওয়া উচিত নিয়ন্ত্রণ। মোবাইল ফোন যেন আমাদের ব্যবহার করে না, বরং আমরা যেন ফোন ব্যবহার করি—এই বোধ তৈরি করাই আসল মুক্তি।
ফোন স্ক্রলিংয়ের নেশা থেকে মুক্তি মানে প্রযুক্তিকে অস্বীকার করা নয়, বরং সচেতনভাবে ব্যবহার করা। সময়, মনোযোগ ও মানসিক শান্তি—এই তিনটি জিনিস ফেরত পেতেই আমাদের ফোনের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।