ঢাবিতে সরস্বতী পূজা
‘বিশ্বাস, শিল্প ও সম্প্রীতির’ বিশ্বমুখী আয়োজন
সনাতন ধর্মের ‘বিদ্যা ও শিল্পের দেবী’ সরস্বতীর আরাধনায় সারা দেশে যখন এর ধর্মাবলম্বীরা উৎসবে মেতে উঠেছেন, তখন এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে আবারও উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) জগন্নাথ হল। আয়োজকদের দাবি, বিপুল সংখ্যক মণ্ডপ ও দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে জগন্নাথ হলের সরস্বতী পূজা বিশ্বের বৃহত্তম আয়োজন হিসেবে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিন দেখা যায়, এ বছর হলের খেলার মাঠ ও উপাসনালয় প্রাঙ্গণ মিলিয়ে মোট ৭৫টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৩টি মণ্ডপ পরিচালনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। বাকি দুটি মণ্ডপের একটিতে হল প্রশাসন এবং অন্যটিতে হলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পূজার আয়োজন করেছেন।
প্রতিটি মণ্ডপেই রয়েছে আলাদা ভাবনা ও নান্দনিকতা। শ্বেতশুভ্র প্রতিমা, সৃজনশীল স্থাপত্য, বর্ণিল আলোকসজ্জা আর ধূপের গন্ধ মিলিয়ে পুরো এলাকা এক অনন্য আবহে ভরে উঠেছে। এ আয়োজন কেবল বর্তমান শিক্ষার্থীদের নয়, বরং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদেরও মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে গড়ে উঠেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
প্রতিবারের মতো এবারও দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে জগন্নাথ হলের পুকুরের মাঝখানে স্থাপিত বিশাল আকৃতির সরস্বতী প্রতিমা। চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের নির্মিত এই প্রতিমা বাঁশ, বেত ও পাটের মতো দেশজ উপকরণে তৈরি। উচ্চতা ও নান্দনিক বিন্যাসে এটি কেবল ধর্মীয় প্রতিমা নয়, বরং একটি পরিপূর্ণ শিল্পকর্ম হিসেবেই আলাদা করে নজর কাড়ছে।
পূজাকে ঘিরে হল প্রাঙ্গণে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মেলা। সেখানে শিক্ষার্থীদের স্টলের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে খাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ নানা পণ্যের সমাহার দেখা গেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের ভিড়ে পুরো এলাকা ছিল উৎসবমুখর।
জগন্নাথ হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) পল্লব চন্দ্র বর্মন স্টার নিউজকে বলেন, ‘এই পূজা কেবল সংখ্যার দিক থেকে নয়, মানের দিক থেকেও অনন্য।’ ‘আমরা বিশ্বাস করি, এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং বিশ্বের সর্ববৃহৎ সরস্বতী পূজা। এই আয়োজনকে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নথিভুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশ্বদরবারে নতুনভাবে পরিচিত হবে’, যোগ করেন বর্মন।
তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের পর হল সংসদ দায়িত্ব নেওয়ায় এবছর আয়োজনকে আরও পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে। পূজার পরদিন একটি কনসার্টসহ বাড়তি কিছু আয়োজনও থাকছে।’
নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ ও পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক দেবাশীষ পাল বলেন, পূজাটি সুশৃঙ্খলভাবে আয়োজন করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। লটারির মাধ্যমে মণ্ডপের স্থান নির্ধারণ, একাধিক উপ-কমিটির মাধ্যমে শৃঙ্খলা রক্ষা, পুষ্পাঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণের পাশাপাশি মানবিক উদ্যোগ হিসেবে রক্তদান কর্মসূচিও রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। প্রবেশপথে মেটাল ডিটেক্টর বসানো হয়েছে, শিশুদের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা নিরাপদ কর্নার। পটকা ও আতশবাজি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণে চালু করা হয়েছে বিশেষ স্টিকার ব্যবস্থাও।’