হাদি হত্যা: ‘শুটার’ ফয়সালের জামিন হয় যেভাবে (ভিডিও)
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা মামলার আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। গাঁ ঢাকা দিয়েছেন তার সহযোগীরাও। তবে গত বছরের অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তারের পর ফয়সালের জামিনের বিষয়টি আলোচনা ও সমালোচনার কেন্দ্রে। প্রশ্ন উঠেছে স্পর্শকাতর অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তারের মাস দুয়েক পর উচ্চ আদালত থেকে কীভাবে জামিন পেলেন?
এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দল। তবে এ নিয়ে কোনো সদুত্তর মেলেনি; উল্টো স্টার নিউজের প্রতিবেদককে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন ব্যারিস্টার অনিক আর হক।
গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ওসমান হাদিকে গুলি করে মোটরসাইকেল আরোহীরা। এই হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান আসামি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান।
এমন নৃশংসতার আগে, রাজধানীর আদাবরে ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর এক ব্যবসায়ীর ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরে ৮ নভেম্বর অস্ত্র-গুলিসহ গ্রেপ্তার হন তিনি। যা র্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি হিসেবে পত্রিকায় ছোট করে সংবাদও ছাপা হয়। কিন্তু, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি জামিন পেয়ে যান ছাত্রলীগের এই নেতা। অস্ত্রসহ ধরা পড়লেও, এত অল্প সময়ে কীভাবে তিনি জামিন পেলেন এবং রাষ্ট্রপক্ষের ভূমিকাই বা কী ছিল, সেই প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেয়।
সাধারণত এমন আসামিদের ক্ষেত্রে জামিনের বিরোধিতা করে অ্যাটর্নি জেনারেল দপ্তরে নোটশিট পাঠান সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। নোটশিটের সঙ্গে মামলার নথিপত্রও যুক্ত করতে হয়। এ ধরনের নোটশিটের ওপর ভিত্তি করে জামিন স্থগিত চেয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে চেম্বার আদালতে চিঠি পাঠানো হয়। শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিমের অস্ত্র মামলার জামিন শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে প্রধান আইনজীবী ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ জুলফিকার আলম শিমুল।
তিনি স্টার নিউজকে বলেন, ‘আমরা জামিনের বিরোধিতা করেছিলাম এবং নোটশিটও অ্যাটর্নি জেনারেল দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।’ নোটশিটের কোনো কপি সরবরাহ করতে পারবেন কি-না? এমন প্রশ্নের জবাবে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ জুলফিকার আলম শিমুল বলেন, ‘১০ মাস আগের হওয়ায় নোটশিটের নথি সংরক্ষিত নেই।’
তার এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে যায় স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দল। অনুমতি নিয়ে খোঁজ নেয় কার্যালয়ের শাখায়। তবে কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানান, তাদের কাছে এমন কোনো নোটশিট আসেনি এবং এমন কোনো নোটশিটও নেই।
সুপ্রিম কোর্টের একাধিক সিনিয়র আইনজীবী জানান, দুটি অস্ত্র ও গুলিসহ আটক হন ফয়সাল করিম মাসুদ। এ ধরনের মামলায় সাধারণত এত দ্রুত জামিন হয় না। জামিন হলেও রাষ্ট্রপক্ষ তথা অ্যাটর্নি জেনারেল দপ্তর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে; কিন্তু এই মামলার ক্ষেত্রে সেটা করা হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু, তিনি স্টার নিউজের প্রতিবেদককে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনিক আর হক ও আরশাদুর রউফের কাছে পাঠান। তবে, দুজনের কেউই এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। উল্টো স্টার নিউজের প্রতিবেদককে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন ব্যারিস্টার অনিক আর হক।
নিষিদ্ধ সংগঠনের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম মাসুদের জামিন প্রাপ্তিতে রাষ্ট্রপক্ষের দায় দেখছেন, রাষ্ট্রপক্ষেরই অন্য আইন-কর্মকর্তারা। সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম স্টার নিউজকে বলেন, ‘দুটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে; অস্ত্র মামলায় কোনোভাবেই এত দ্রুত জামিন হয় না। কীভাবে জামিন হলো, সেটা খতিয়ে দেখতে তদন্ত হওয়া দরকার; এখানে একটা বড় সিন্ডিকেট কাজ করেছে। জড়িতদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত করা দরকার। তা না হলে বিচারাঙ্গনের কালো বিড়াল দূর হবে না।’
আরেক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘অস্ত্র মামলার আসামি জামিন পেয়ে আরও গুরুতর অপরাধের প্রধান আসামি হন। জামিন পাওয়ায় কারও না কারও দায় আছে এবং এখানে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে বলে মনে করি।’
জামিন বিরোধিতা করে নোটশিট পাঠানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট কোর্টের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তথা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জামিনের বিরোধিতা করে অ্যাটর্নি জেনারেল দপ্তরে নোটশিট পাঠানোর কথা বলেছেন, আবার অ্যাটর্নি জেনারেল দপ্তর থেকে বলা হচ্ছে, কোনো নোটশিট সেখানে পাঠানো হয়নি। এখন যদি নোটশিট পাঠানো হয়েও থাকে তাহলে জামিন স্থগিত চেয়ে কিন্তু চিঠি পাঠানোর কথা অ্যাটর্নি জেনারেল দপ্তরের; সেটিও কিন্তু করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে তো অবশ্যই রাষ্ট্রপক্ষের কারো না কারও দায় আছে।’
নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ফয়সাল করিম মাসুদের মতো এমন আরও অনেক সন্দেহভাজন কারামুক্ত হয়েছেন বলে শঙ্কা জানিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) আব্দুল হক স্টার নিউজকে বলেন, ‘একজন অস্ত্র মামলার আসামি জামিন পায় কীভাবে? এ ধরনের আসামিকে জামিন দিতে কি একবারও বিবেকে বাঁধলও না? রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কি কখনও সাধারণ মানুষ, খেটে-খাওয়া মানুষের জামিনের জন্য দাঁড়িয়েছেন? মিথ্যাকে সত্য বলে উপস্থাপন করলো আর জামিন হয়ে গেলো? রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফ্যাসিবাদের দোসর না হলে এমন মামলায় জামিন হওয়া কথা না।’
জামিন ইস্যুতে মন্তব্য না করলেও পুলিশ বলছে, ফয়সাল করিম মাসুদসহ তার সহযোগীদের ধরতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে তারা।
ভিডিও প্রতিবেদন দেখুন এখানে ...