Search

Search

বাণিজ্যিক সম্পর্কের চেয়েও বেশি কিছু ভারত-ইইউ’র চুক্তি

ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি | ছবি: সংগৃহীত

প্রায় দুই দশক ধরে বিরতি দিয়ে চলেছে আলোচনা। অবশেষে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করেছে ভারত। আলোচিত এই চুক্তিকে দুই পক্ষই ‘মাদার অব অল ডিলস’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

গেল মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) নয়াদিল্লিতে ভারত-ইইউ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। বলা হচ্ছে, বাণিজ্যিক হলেও এই চুক্তির রয়েছে সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব। কেবল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ যৌথ বাজার হিসেবে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণেই নয়, বরং নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা যখন ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে—তখন এমন একটি চুক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এই চুক্তিকে ভারতের একসময়ের রক্ষণশীল মুক্ত বাণিজ্য কৌশলের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বৃহৎ অর্থনৈতিক পরিসর

২০০৭ সালে ভারত-ইইউপ্রথম এফটিএ নিয়েকাজ শুরু করে। কিন্তু অটোমোবাইল, কৃষি, মদ ও মদ জাতীয় পণ্য এবং ডেটা সংক্রান্ত বিধিনিষেধের মতো নানা ইস্যুর কারণে আলোচনা বারবার থমকে যায়।

তবে উভয়পক্ষের শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণে ২০২২ সাল থেকে আলোচনায় নতুন গতি আসে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন ও তার কমিশনারদের দল নয়াদিল্লি সফর করেন। তখন এ চুক্তি নিয়ে অগ্রগতি আরও ত্বরান্বিত হয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তন এবং বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে উভয়পক্ষই উপলব্ধি করছে যে শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়।

শুধুমাত্র পরিসরের বিশালতার কারণেই বাণিজ্য চুক্তিটির গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। এটি বিশ্বের কয়েকটি বৃহত্তম অর্থনীতিকে একত্রিত করেছে—এর মধ্যে রয়েছে ভারত, যা বিশ্বে পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালির মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান সদস্য রাষ্ট্রগুলো, যেগুলো যথাক্রমে তৃতীয়, সপ্তম ও অষ্টম স্থানে রয়েছে।

ভারত ও ইইউ মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল বাজার, যেখানে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ বসবাস করে। এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও জনসংখ্যার প্রায় এক–চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ইইউ’র সঙ্গে এই এফটিএ ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুক্তি। আর যুক্তরাষ্ট্রের পর এটি ইইউ’র দ্বিতীয় বৃহত্তম চুক্তি।

বাণিজ্য চুক্তির চেয়েও বেশি কিছু

বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার ও অর্থনৈতিক লাভের বিষয়গুলো ছাড়াও, এই চুক্তিটি কেবল বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক নির্ভরতার প্রেক্ষাপটে চুক্তিটিকে ঝুঁকি কমানো ও সাপ্লাই চেইনে ভারসাম্য জোরদারের একটি কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির দুই জায়ান্ট যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারের খেলায় ২০২৫ সালটা অস্বস্তিকর কেটেছে। এই সময়টা যুক্তরাষ্ট্র একতরফা শুল্কারোপ ও চীন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভারতকে চাপে রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। আবার ভারত এখনও চীনা পণ্যের অন্যতম বড় আমদানিকারক হিসেবেই রয়ে গেছে। তবে বর্তমানে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্কের কারণে চাপের মুখে পড়ছেন। পাশাপাশি চীন গত বছর স্বল্প সময়ের জন্য বিরল খনিজ রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করায় ভারতের আমদানিকারকরা—বিশেষ করে অটোমোবাইল ও যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারকরা—বেশ বিপাকে পড়েন।

আধুনিক বাণিজ্য বিধি ও উদার বাজার সুবিধাসহ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) মাধ্যমে বিশ্বের আরও বড় বড় অর্থনীতির সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে উঠলে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা বৈশ্বিক বাজারে অধিকতর অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পাবেন। পাশাপাশি, দেশীয় রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো একাধিক দেশ থেকে কাঁচামাল ও উপকরণ সংগ্রহের সুযোগ পাবে, যা বিভিন্ন সাপ্লাই চেইনের ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে এক বা দুটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা স্বাভাবিকভাবেই অর্থনৈতিক চাপের ঝুঁকি বাড়ায়। ইইউ’র সঙ্গে ভারতের সবশেষ বাণিজ্য চুক্তির উদ্দেশ্য অধিকতর বৈচিত্র্যকরণের সুযোগ সৃষ্টি করে সেই ঝুঁকির বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

ভারতের বাণিজ্য কৌশলের উচ্চতম পর্যায়

ইইউ’র সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তিটি গত চার বছরে ভারতের এ ধরনের নবম চুক্তি। এটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে যুক্ত হওয়া নিয়ে ভারতের অবস্থান থেকে সরে আসার স্পষ্ট ইঙ্গিত। ২০২২ সাল থেকে ভারত একের পর এক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে—সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অস্ট্রেলিয়ার মাধ্যমে যার সূচনা হয়। এরপর আইসল্যান্ড, লিশটেনস্টাইন, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডকে নিয়ে গঠিত ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য সংস্থার (ইএফটিএ) সঙ্গে চুক্তি হয়। গত বছর এই গতি আরও বেড়ে যায়, যখন ভারত ওমান, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে এফটিএ’তে প্রবেশ করে।

ভারতের সাম্প্রতিকতম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলো আগের যেকোনো চুক্তির তুলনায় পরিসর এবং বাজার প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে অনেক বেশি বিস্তৃত। এ চুক্তিগুলোতে একবিংশ শতকের বাণিজ্য বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেমন—ডিজিটাল বাণিজ্য, সরকারি ক্রয় নীতি, প্রতিযোগিতা নীতি, পাশাপাশি শ্রম এবং পরিবেশ মান।

এছাড়া কৃষি ও দুগ্ধ শিল্পের মতো যথেষ্ট সংবেদনশীল খাতকে সুরক্ষা দিয়ে ভারত কয়েকটি পণ্যের উপর শুল্ক কমাচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে খাদ্যপণ্য, পানীয় এবং অটোমোবাইল। আবার আগে সুরক্ষিত দেশীয় সেবা খাত যেমন অ্যাকাউন্টিং এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি (ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি) সংক্রান্ত নিয়মগুলো আরও উদার করে বিদেশি সরবরাহকারীদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

ইইউর সঙ্গে এই চুক্তিতেও উপরের সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চুক্তিতে বিশ্বমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এমন বাণিজ্য বিধি থাকায় এটি ভারতের বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠার ইঙ্গিত বহন করে।

নিয়মভিত্তিক বাণিজ্যের জন্য ইতিবাচক বার্তা

বিভিন্ন বাণিজ্য বিষয় নিয়ে ভারত এবং ইইউ’র মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবেই মতপার্থক্য ছিল। বিনিয়োগ সহজীকরণ, ই-কমার্স লেনদেনে করারোপ, কৃষি ভাতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে এখনও দ্বিমত রয়েছে।
তবুও, এই পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তারা একটি দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে সক্ষম হয়েছে, যা বৈশ্বিক নিয়মভিত্তিক বাণিজ্যকে শক্তিশালী করার জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়।

বার্তাটি হলো—বাণিজ্য নিয়ে ভিন্নমত থাকা দুটি প্রধান বৈশ্বিক শক্তি তাদের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রেখে নীতি ও কাঠামোগত নিয়ম নিয়ে আলোচনা করতে সক্ষম হয়েছে। এর অর্থ হলো, আরও অনেক দেশ, বিশেষ করে গ্লোবাল নর্থ ও গ্লোবাল সাউথের মধ্যে থাকা বিরোধপূর্ণ মতাদর্শের দেশগুলো, পারস্পরিক সম্মতিপূর্ণ বাণিজ্য নিয়ম তৈরি করার আশা রাখতে পারে।

এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এমন এক সময়ে এই চুক্তি হলো যখন প্রধান শক্তিগুলোর বাণিজ্য-সীমাবদ্ধ নীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য বিধিকে অস্থিতিশীল করছে। প্রধান শক্তিগুলোর এই ধরনের পদক্ষেপ অন্য বৈশ্বিক খেলোয়াড়দেরও তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থে বৈশ্বিক বাণিজ্যে আরও গভীরভাবে সহযোগিতা করতে প্ররোচিত করতে পারে। সেক্ষেত্রে ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে।

>অমিতেন্দু পলিত,সিনিয়র রিসার্চ ফেলো এবং রিসার্চ হেড (বাণিজ্য ও অর্থনীতি),ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ

সিএনএ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে ভাষান্তর করেছেন আহাম্মদ উল্লাহ সিকদার

সম্পর্কিত খবর :