Search

Search

এক্সক্লুসিভ ও ব্রেকিং খবর পেতে আপনার মোবাইল নম্বরটি দিন

স্টার পরিবারে আপনাকে স্বাগতম। নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা স্প্যাম করি না।

এইচআরএসএস:

গত বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩৩ ও গণপিটুনীতে ১৬৮ জন নিহত

প্রতীকী
সারাদেশে ২০২৫ সালে ৯১৪ রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩৩ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৫১১ জন। মব সহিংসতা ও গণপিটুনীতে নিহত ১৬৮ ও আহত ২৪৮ জন। হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫৩৯ জন সাংবাদিক। কারাগারে ৩০ কয়েদী ও ৬২ হাজতির মৃত্যু হয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিহত হয়েছেন ৩২ জন এবং আহত ও আটক হয়েছেন ১০২ জন।

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং নিজেদের তথ্যানুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে সারাদেশে রাজনৈতিক ও দলীয় আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ পরায়ণতা, সমাবেশ কেন্দ্রিক সহিংসতা, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখল কেন্দ্রিক ৯১৪টি সহিংসতায় ১৩৩ জন নিহত। এর মধ্যে (বিএনপির ৯৩ জন, আওয়ামী লীগের ২৩ জন, জামায়াতের ৩ জন, ইনকিলাব মঞ্চের ১ জন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ১ জন, ইউপিডিএফের ৬ জন এবং চরমপন্থী দলের ১ জন) এবং ৭৫১১ জন আহত হয়েছে।

এ ছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী সহিংসতার ৫৪টি ঘটনায় ৩ জন নিহত এবং ৪৯৪ জন আহত হয়েছে।

২০২৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামীলীগ এবং অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের নামে কমপক্ষে ২৪৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১১ হাজার ৯৩৫ জনের নাম উল্লেখ করে ৪২ হাজার ৫২৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন মামলায় ও যৌথবাহিনীর অভিযানে ৫০ হাজারের অধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী । এ ছাড়া, পুলিশ গত এক বছরে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহ্‌রীরের অন্তত ৪৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে সারাদেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৯২টি ঘটনায় মব সহিংসতা ও গণপিটুনীতে ১৬৮ জন নিহত ও ২৪৮ জন আহত হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে সারাদেশে ৩১৮টি হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩ জনকে হত্যা, ২৭৩ জনকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও আহত, ৫৭ জন লাঞ্ছিত, ৮৩ জনকে হুমকি এবং ১৭ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়াও ৩৪টি মামলায় ১০৭ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এর অধীনে ২৭টি মামলায় ২৪ জনকে গ্রেপ্তার এবং ৫৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্বারা সারাদেশে ৪৭টি সভা-সমাবেশ আয়োজনে বাধা প্রদান, ১৪৪ ধারা জারি, সংঘর্ষ, সভা সমাবেশ থেকে আটকসহ বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। এতে ৫১২ জন আহত এবং ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বিচার বহির্ভূত হত্যা, থানা ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশি হেফাজত, নির্যাতন, গুলি, বন্দুকযুদ্ধ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংষর্ষ ইত্যাদি ৪০ জন নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে ৬ জন সংঘর্ষে বা কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে, ১২ জন নির্যাতনে, ১২ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এবং ১০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া পুলিশের ভয়ে পালাতে গিয়েও অসুস্থ হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া কারাগারে বা কারা হেফাজতে কমপক্ষে অসুস্থ, আত্মহত্যা ও নির্যাতনে ৯২ জন আসামি (৩০ জন কয়েদী ও ৬২ জন হাজতি) মারা গেছেন।
২০২৫ সালে কমপক্ষে ২০৪৭ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮২৮ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এর মধ্যে ৪৭৪ জন ১৮ বছরের কম বয়সী। এ ছাড়া ১৭৯ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর হত্যা ২৮ জনকে করা হয়েছে।

এ ছাড়া এসব ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন নারী । ৪১৪ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তার মধ্যে শিশু ২৩৬ জন। এ ছাড়া যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৩৫ জন (আত্মহত্যা ৪ জন) ও আহত ৩২ জন। তাছাড়া পারিবারিক সহিংসতায় ৩৮৩ জন (আত্মহত্যা ১৯৪ জন) নিহত ও আহত ১৩৩ জন। এসিড সহিংসতায় শিকার হয়ে নিহত ২জন এবং আহত ২ জন।

অন্যদিকে, শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক হাজার ৩৭১ জন। যাদের মধ্যে ২৮৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং এক হাজার ৮৩ জন শিশু বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

সীমান্তে হতাহত, আটক ও অবৈধভাবে পুশইনের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত ৩০ জন নিহত। এ ছাড়া ২ জনকে পিটিয়ে হত্যা, আহত ৩৯ জন এবং ৬৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় নাগরিকদের গুলিতে ও হামলায় অন্তত ৭ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে কমপক্ষে ৩ হাজার ৪৯৩ জনকে বাংলাদেশে পুশইন ও ভারতীয় জলসীমার কাছে বঙ্গোপসাগর থেকে ১৪৩ জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে ভারতীয় কোস্টগার্ড।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হয়ে ২ জন আহত হয়েছেন। আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে এক আনসার সদস্যসহ ১২ জন বাংলাদেশী আহত এবং ১ জন নিহত হয়েছেন। সীমান্তের নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের জলসীমা থেকে ২১টি ট্রলারসহ কমপক্ষে ১৭৬ জন জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মাজারে হামলার ঘটনার উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে ২৮টি হামলার ঘটনায় ১ জন নিহত, ১৬ জন আহত, ৬টি মন্দির, ৩৭টি প্রতিমা ও ৩৮টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর এবং ৫টি জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া সারাদেশে ৫৬টিরও বেশি মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এতে মাজারে ও বাউল অনুসারীদের মধ্যে একজন নিহতসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে।

শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ৩৫৯টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় শ্রমিক অসন্তোষ, শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, হামলাসহ নানা কারণে ৯৬ জন নিহত ও ১০২১ জন আহত হয়েছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১৬৮ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া ৪ জন গৃহকর্মী মালিকের নির্যাতনে নিহত এবং ৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মব সহিংসতা, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা, নির্বাচনী সহিংসতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের বিষয় সমাধান না করা হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।

এ সময় সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।

সম্পর্কিত খবর :